বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | Bankim Chandra Chatterjee | बंकिमचन्द्र चट्टोपाध्याय

মেদিনীপুরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Bankim Chandra in Medinipur | मेदिनीपुर में बंकिमचन्द्र

অরিন্দম ভৌমিক।


(১২ আষাঢ় ১২৪৫ - ২৬ চৈত্র ১৩০০ বঙ্গাব্দ)

(২৬ জুন ১৮৩৮ - ৮ এপ্রিল ১৮৯৪)

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন (১২ আষাঢ় ১২৪৫ বঙ্গাব্দ) বর্তমান উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নৈহাটি শহরের কাছে কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পূর্বপুরুষের আদিনিবাস ছিল হুগলি জেলার দেশমুখো গ্রামে। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রপিতামহ রামহরি চট্টোপাধ্যায় মাতামহের সম্পত্তি পেয়ে কাঁঠালপাড়া গ্রামে আসেন এবং পাকাপাকি ভাবে থেকে যান। রামহরির পৌত্র যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তৃতীয় পুত্র বঙ্কিমচন্দ্র,মাতা দুর্গাসুন্দরী দেবী। বঙ্কিমের আগে শ্যামাচরণ ও সঞ্জীবচন্দ্র নামে তাঁর আরও দুই পুত্রের জন্ম হয়। বঙ্কিমের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৩৬ সালে মেদিনীপুর কালেক্টরের অধীনে খাজাঞ্চির চাকুরী গ্রহণ করেন এবং ১৮৩৮ সালে পদোন্নতির জন্য ডেপুটি কালেক্টরের পদ লাভ করেন। ১৮৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই জেলার মেদিনীপুর (শহর), হিজলী এবং অন্যান্য বহু স্থানে সরকারী জমি বিলি বন্দোবস্তের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি ঐ সময় প্রজা সাধারণের পানীয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য বহু জনহিতকর কাজ করেছিলেন। এই কাজ করার সময়ে তিঁনি কাঁথি মহকুমার খেজুরীতে এমনকি দুর্গম বনের মধ্যে বাঘের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে লোকজনের চিৎকারে বাঘের আক্রমণ থেকে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | Bankim Chandra Chatterjee | बंकिमचन्द्र चट्टोपाध्याय

স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (যৌবনে)।


স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন-চরিত গ্রন্থে শ্রী শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন - "পঞ্চম বৎসর বয়সে মেদিনীপুরে বঙ্কিমচন্দ্রের 'হাতে খড়ি' হয়। তার কিছুকাল পরে বঙ্কিমচন্দ্রকে জননীর সঙ্গে কাঁঠালপাড়ায় আসিতে হয়”। শিশু বয়সেই তার অসামান্য মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। বঙ্কিমের কণিষ্ঠ সহোদর পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “শুনিয়াছি বঙ্কিমচন্দ্র একদিনে বাংলা বর্ণমালা আয়ত্ত করিয়াছিলেন।” যদিও গ্রামের পাঠশালায় বঙ্কিম কোনওদিনই যান নি। পাঠশালার গুরুমশাই রামপ্রাণ সরকার বাড়িতে তার গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা থেকে অনুমান করা যায় যে তিনি রামপ্রাণের শিক্ষা ব্যাবস্থায় খুব একটা খুশি ছিলেন না। তিনি লিখেছেন, “সৌভাগ্যক্রমে আমরা আট দশ মাসে এই মহাত্মার হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিয়া মেদিনীপুর গেলাম।”

১৮৪৪ সালে বঙ্কিমচন্দ্র পিতার কর্মস্থল মেদিনীপুরে আসেন এবং প্রকৃত শিক্ষার সূচনা হয়। বাবার সঙ্গে কর্ণেলগোলার বাসায় থাকতেন। তখন মেদিনীপুর জেলা স্কুলের (বর্তমান কলিজিয়েট স্কুল) প্রধান শিক্ষক ছিলেন এফ টিড সাহেব। তাঁরই পরামর্শে যাদবচন্দ্র শিশু বঙ্কিমকে তাঁর স্কুলে ভর্তি করে দেন। এখানেও বঙ্কিম অল্পকালের মধ্যেই নিজ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হন। পূর্ণচন্দ্রের রচনা থেকে জানা যায়, বার্ষিক পরীক্ষার ফলে সন্তুষ্ট হয়ে টিড সাহেব বঙ্কিমকে ডবল প্রমোশন দিতে উদ্যত হলে যাদবচন্দ্রের হস্তক্ষেপে তিনি নিরস্ত হন। ১৮৪৭ সালে টিড ঢাকায় বদলি হয়ে গেলে সিনক্লেয়ার তার স্থলাভিষিক্ত হন; তাঁর কাছেও বঙ্কিম প্রায় দেড় বছর ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের ইংরেজি বর্ণমালা শিখতে কতদিন লেগেছিল জানা নাই কিন্তু সেই সম্পর্কে মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুলের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য -

অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত ডেবরা থানার এক ভদ্রলোক বঙ্কিমচন্দ্রের সহপাঠী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, একদিন মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে এক খোট্টা, বানর নিয়ে ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে যাচ্ছিলেন। বঙ্কিম সেই শব্দে আকৃষ্ট হয়ে বানর দেখতে ছুটলেন। বানরটির প্রতি পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বঙ্কিম বলেছিলেন, "বাঁদরটাকে এনে, আমাদের ক্লাসে ভর্তি করে দিলে হয়; দেখি, ইংরেজি শিখতে পারে কিনা। "

বঙ্কিম, বাঁদর দেখে যখন ক্লাসে ফিরে এলেন, তখন পড়ায় মনোযোগ না থাকার জন্য শিক্ষকের কাছে খুব বকুনি খেয়েছিলেন। বকুনির পর সম্বিৎ ফিরে এলে বঙ্কিম বিদ্যুৎদীপ্ত চোখে একবার শিক্ষকের দিকে তাকালেন এবং তারপর নিজের জায়গায় বসে একমাসের পড়া একঘন্টায় শেষ করলেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | Bankim Chandra Chatterjee | बंकिमचन्द्र चट्टोपाध्याय

স্বর্গীয় যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।


মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুলে পড়াকালীন বঙ্কিমচন্দ্রের বালকসুলভ কোন খেলায় আগ্রহ ছিল না। স্কুল ছুটির পরে সবাই কত রকম খেলায় মত্ত থাকত কিন্তু বঙ্কিমের আগ্রহ ছিল তাস খেলায়। ছুটির পর তিনি তাস খেলতে বসতেন।

যাদবচন্দ্র ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুর থেকে ২৪ পরগনায় বদলি হয়ে যান। বঙ্কিমচন্দ্র পুনরায় কাঁঠালপাড়ায় ফিরে আসেন। সেই বছরই (১৮৪৯) বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বিয়ে হয়। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১১ বছর। নারায়নপুর গ্রামের এক পঞ্চমবর্ষীয়া বালিকার সাথে তার বিয়ে হয়। স্ত্রীকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম কর্মস্থল যশোর। রূপবতী, সর্বগুণময়ী সহধর্মিনীকে ছেড়ে যশোর যেতে বঙ্কিমের প্রচন্ড কষ্ট হয়েছিল। তার ঠিক এক বছর পরেই চাকুরি জীবনের শুরুতে (১৮৫৯) বঙ্কিমচন্দ্র স্ত্রীকে হারালেন।

বঙ্কিমচন্দ্র অবিভক্ত মেদিনীপুরে ফিরে আসেন ১৮৬০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী নেগুয়াঁয় (এগরা) ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে। এই নেগুয়ায় বঙ্কিমচন্দ্র, কাপালিকের দেখা পেয়েছিলেন। সামনেই ছিল সমুদ্র। সময় পেলেই মাঝে-মধ্যে সমুদ্র দেখতে যেতেন। বাড়ি থেকে সমুদ্রের শব্দ শোনা যেত। বিপত্নীক বঙ্কিম রাত্রে বিছানায় শুয়ে সেই শব্দ শুনতেন আর নীরবে কাঁদতেন। বঙ্কিমের মনোকষ্টের কথা জানতেন তাঁর বাবা-মা। তাঁরা সেই বছরই (১৮৬০) জুন মাসে হালি শহরের বিখ্যাত চৌধুরী বংশের কন্যা রাজলক্ষী দেবীর সঙ্গে বঙ্কিমের দ্বিতীয়বার বিয়ে দিলেন।

নেগুয়াঁ স্থানটি ত্রগরা থেকে প্রায় পনের কিলোমিটার দক্ষিণে ত্রগরা-রামনগর পথে। সেই সময়ে মাটির রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে উটের গাড়ি চলত। বঙ্কিমচন্দ্র সরকারী ডাকবাংলো থেকে উটের গাড়িতে বা পালিকতে যাতায়াত করতেন। মাঝে মাঝে তিনি সমুদ্রের কাছে চাঁদপুরের বাংলোতে থাকতেন। সমুদ্র, ঝাউবন, বালিয়াড়ী ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির রুপ উপভোগ ছিল তাঁর অফিস-কাচারির বাইরের কাজ। ত্রর মধ্যে চাঁদপুর বাদে দরিয়াপুর, দৌলতপুর জায়গাগুলোও তাঁর পরিচিত হয়ে ওঠে।

তাঁর নেগুয়াঁ চাকরীতে অলৌকিক ঘটনার কথা লিখেছেন তাঁর ভাই পূর্ণচন্দ্র। যখন বঙ্কিমচন্দ্র নেগুয়াঁ মহকুমাতে ছিলেন তখন সেইখানে ত্রকজন সন্ন্যাসী কাপালিক তাঁহার পশ্চাৎ লইয়া ছিল, মধ্যে মধ্যে নিশীথে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিত .......।

তাঁর বড় দাদা শ্যামাচরনের পুত্র শচীশচন্দ্র ত্র সম্পর্কে লিখেছেন - বঙ্কিমচন্দ্র যখন নেগুয়াঁয়, তখন নিশীথে তাঁহার বাটীর দ্বারে সবলে করাঘাত হইল। রাত্রি তখন প্রায় আড়াই প্রহর।....... বঙ্কিমচন্দ্র দ্বারে আসিয়া দেখিলেন, ত্রকজন দীর্ঘাকায় সন্ন্যাসী নরকপাল হস্তে দন্ডায়মান ...... ।

নেগুয়াঁয় থাকাকালীন একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য -

বঙ্কিমচন্দ্র একদিন কাজে মফঃস্বলে গেছিলেন। স্থানীয় জমিদার বঙ্কিমচন্দ্রকে রাত্রে থাকার জন্য তার বাগানবাড়িতে ব্যবস্থা করেছিলেন। রাত্রিবেলায় বঙ্কিমচন্দ্র একা একটি ঘরে বসে লেখাপড়া করছিলেন। তখন রাত্রি ১ টা, হঠাৎ সেই ঘরে সাদা কাপড় পরে এক মহিলা প্রবেশ করলেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাকে দেখে চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কে ?" কোন উত্তর এলোনা। বঙ্কিমচন্দ্র আবার জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি চাও ?" না কোন উত্তর নাই। বঙ্কিমচন্দ্র উঠে দাঁড়ালেন এবং একটু এগিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কথার উত্তর দাও না কেন ? তুমি মানুষ, না প্রেতিনী ?"

বঙ্কিমচন্দ্র এগিয়ে আসছেন দেখে মহিলা খোলা দরজা দিয়ে বেরিয়ে বাগানে গেলেন। বঙ্কিমচন্দ্র তাকে অনুসরণ করলেন। বাগানে এসে মহিলার পশে দাঁড়িয়ে দেখলেন সে ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অবশেষে মহিলা বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে গেল। বঙ্কিমচন্দ্র কিছুক্ষন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পরে ঘরে ফিরে এসে ভৃত্যকে আদেশ করলেন, "আমি এখনি এখন থেকে চলে যাব - পাল্কী প্রস্তুত কর।"

এইসব ঘটনার ফসল - কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬ সালের শেষ দিকে)। ডেপুটি মেজিস্ট্রেট চাকরির শেষ সময়ে তিনি মেদিনীপুরে কিছুদিন ছিলেন। যে বাংলোতে তিনি থাকতেন সেটি ত্রখন ধবংসপ্রাপ্ত তবে চাঁদপুরের বাংলোর নিদর্শন আছে।

অবিভক্ত মেদিনীপুরে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অবস্থান স্বল্পকালের হলেও ঐ সময়ের মধ্যে তাঁর জীবনে যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল সেগুলি অবিভক্ত মেদিনীপুরের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রসুলপুর নদী, মোহনাবর্তী সমুদ্র-সৈকত, দরিয়াপুর-দৌলতপুর গ্রামের ঘন অরণ্য - এমন পটভূমি নিয়েই তাঁর 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাস। নিসর্গের এই ভয়াল-মধুর রূপের আবিষ্কার একজন কবিমনীষীর পক্ষেই সম্ভব। মেদিনীপুরের একটি প্রান্তের সৌন্দর্য নিয়ে বঙ্কিমের বর্ণনা শুনলে গর্ব অনুভব হয় -

'অনন্ত জলরাশি চঞ্চলরবিরশ্মিমালাপ্রদীপ্ত হইয়া গগণপ্রান্তে গগনসহিত মিশিয়াছে।' ………… 'রসুলপুরের মুখ হইতে সুবর্ণরেখা পর্যন্ত অবাধে কয়েক যোজন পথ ব্যাপিত করিয়া এক বালুকাস্তূপশ্রেণী বিরাজিত আছে। আর কিছু উচ্চ হইলে ঐ বালুকাস্তূপশ্রেণীকে বালুকাময় ক্ষুদ্র পর্বতশ্রেণী বলা যাইতে পারিত। এক্ষণে লোকে উহাকে বালিয়াড়ি বলে। ঐ সকল বালিয়াড়ির ধবল শিখরমালা মধ্যাহ্ন সূর্যকিরণে দূর হইতে অপূর্ব প্রভাবিশিষ্ট দেখায়। উহার উপর উচ্চ বৃক্ষ জন্মে না। স্তূপতলে সামান্য ক্ষুদ্র বোন জন্মিয়া থাকে, কিন্তু মধ্যদেশে বা শিরোভাগে প্রায়ই ছায়াশূন্যা ধবলশোভা বিরাজ করিতে থাকে। অধোভাগমন্দনকারী বৃক্ষাদির মধ্যে ঝাটী, বনঝাউ এবং বনপুষ্পই অধিক।'

অবিভক্ত মেদিনীপুরের একটি প্রান্তের এমন নিখুঁত বর্ণনা আমরাই কি কোনদিন দিতে পেরেছি। 'কপালকুণ্ডলা' প্রধান নারীচরিত্র, সে তো আমাদেরই দরিদ্র ঘরের মেয়ে মৃন্ময়ী। নায়ক নায়িকার প্রথম সাক্ষাৎকারে কপালকুণ্ডলার যে রূপ বর্ণিত হয়েছে তার তুলনা নেই –

“অপূর্ব রমণীমূর্তি ! অবেণীসংবদ্ধ, সংসপির্ত, রাশীকৃত, আগুলফলম্বিত কেশভার; তদগ্রে দেহরত্ন; যেন চিত্রপটের উপর চিত্র দেখা যাইতেছে।“

কাঁথির নিমক মহলের দেওয়ান রাজা কৃষ্ণকান্ত মনোহরচকে একটি পুকুর খনন করেন। কৃষ্ণকান্ত সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দে্রর পিতা যাদবরাম চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। যাদবরাম ডেপুটি কালেক্টর হিসাবে এই অঞ্চলে অনেক জনহিতকর কাজ করেছিলেন। নেগুয়াঁয় বেশি সময় থাকলেও কাঁথিতে সরকারী কাজে এসে থাকতেন স্কুল বাজারে উকিল বারানসী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে। সেই কারনেই অনেকে মনে করেন এই কৃষ্ণকান্ত পুকুর এলাকায় থাকা কালিন কৃষ্ণকান্তের-উইল উপন্যাসের পরিকল্পনা তাঁর মনে এসেছিল। পুকুরের পাশের রাস্তাটির নামও বর্তমানে 'ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র সরণী' নাম চিহ্নিত। গুণমুগ্ধ কাঁথিবাসী দারিয়াপুরে 'বঙ্কিম মেলা' পরিচালনা করেন। স্থাপিত হয়েছে বঙ্কিম স্মৃতিস্তম্ভ।

এবার আসি অবিভক্ত মেদিনীপুরের আরেক ঐতিহাসিক শহর তমলুক প্রসঙ্গে। তাম্রলিপ্তর পটভুমিকায় সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা যুগলাঙ্গরীয় ১২৮০ বঙ্গাব্দে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালেই এর পাঁচটি সংস্করণ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। ইংরেজীতে যুগলাঙ্গরীয়ের একাধিক অনুবাদ ১৮৯৩-১৯১৯ এর মধ্যে প্রকাশিত হয়। ১৮৮০ খ্রীষ্টাব্দে কে. আর. ভাট যুগলাঙ্গরীয় হিন্দীতে অনুবাদ করেন। বঙ্কিম-জীবনীকার শচীশচন্দ্র লিখেছেন, তমলুকের রাজার একটি বাগান ছিল যার নিচ দিয়ে রূপনারায়ণ প্রবাহিত। দাদা শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় তমলুকে ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে বঙ্কিমচন্দ্র সেখানে যান এবং বাগানের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন। শচীশচন্দ্র আরো জানিয়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্র যখন ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে তমলুকে বেড়াতে এসেছিলেন, তখন তাঁরও তমলুক ভাল লেগেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র রূপনারায়ণ দেখলেন – মৃদু পবনোত্থিত অতুঙ্গ তরঙ্গে বালারুণরশ্মি অরোহন করিয়া কাঁপিতেছে - শ্যামাঙ্গীর অঙ্গে রজতালঙ্কারবৎ ফেননিচয় শোভিতেছে, তীরে জলচর পক্ষীকুল শ্বেতরেখা সাজাইয়া বেড়াইতেছে। আর বঙ্কিমচন্দ্র সেই রূপনারায়ণতটোপরি দেখিলেন, এক বিচিত্র অট্টালিকা। তাহার নিকট একটি সুনির্ম্মিত বৃক্ষবাটিকা। তমলুকের এই দৃশ্য - বঙ্কিমচন্দ্রের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। পনের বছর পরে তমলুকের এই ছবি তুলে নিয়ে যুগলাঙ্গরীতে বসিয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র কিন্তু গ্রন্থের পাদটিকায় নিযেই জানিয়েছেন প্রাচীন নগর তাম্রলিপ্তের আধুনিক নাম তমলুক।

দুর্গেশনন্দিনীতে জাহানাবাদ পরগণা ও গড় মান্দারণ (বর্তমানের আরামবাগ মহকুমা যা সেকালে মেদিনীপুরের অংশ ছিল) এই জেলারই স্মৃতির সাক্ষর।

নেগুয়াঁর পরে বঙ্কিমচন্দ্র খুলনা, বারুইপুর (২৪ পরগনা), মুর্শিদাবাদ, কলিকাতা, আলিপুর, জাজপুর (কটক), হাবড়া ও ঝিনাইদহতে দীর্ঘ কর্মজীবন কাটানোর পরে ১৮৯১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অবসর গ্রহণ করেন।

শেষ জীবনে তার স্বাস্থ্য বিশেষ ভালো ছিল না। ১৮৯৪ সালের মার্চ মাসে তার বহুমূত্র রোগ বেশ বেড়ে যায়। এই রোগেই ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল (বাংলা ২৬ চৈত্র ১৩০০ সাল) অবশেষে তাঁর মৃত্যু হয়।

সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মৃত্যুর আগে বঙ্কিমচন্দ্র কাঁথিতে বায়ু পরিবর্তনে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তাঁর ভাইপো শ্রীশচন্দ্রের কাছে। তখন রমেশচন্দ্র দত্ত ছিলেন মেদিনীপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট।


অরিন্দম ভৌমিক।

midnapore.in

(Published on 12.01.2008 / Updated on 26.06.2020)

তথ্যসূত্র:-

স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবন-চরিত, শ্রী শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সঙ্কলিত, কলকাতা, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ (Published by- Surendra Nath Banerjee at the Universal Library)।

মেদিনীকথা - পূর্ব মেদিনীপুর, পর্যটন ও পুরাকীর্তি, অরিন্দম ভৌমিক, পৃষ্ঠা-২২০ (Arindam’s, ২৯ আষাঢ় ১৮২৩)।

সাহিত্যচর্চায় কাঁথি - চিত্ত সাহু।

মেদিনীকথা - পূর্ব মেদিনীপুর, পর্যটন ও পুরাকীর্তি, অরিন্দম ভৌমিক, পৃষ্ঠা-৩১ (Arindam’s, ২৯ আষাঢ় ১৮২৩)।

কথাসাহিত্য তাম্রলিপ্ত, কৌশিক আনন্দ – তমলুক পৌরসভা তথ্যপঞ্জী ২০০০, অধ্যায়-৩, পরিচ্ছেদ-৩।

মেদিনীকথা - পূর্ব মেদিনীপুর, পর্যটন ও পুরাকীর্তি, অরিন্দম ভৌমিক, পৃষ্ঠা-২৩৫ (Arindam’s, ২৯ আষাঢ় ১৮২৩)।

গুণীজনের কাঁথি আগমন - স্বপন কুমার মন্ডল।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (জীবনকথা), বঙ্কিম রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা।

সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী, বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা।

প্রবন্ধ বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্যশিক্ষা, পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম-প্রসঙ্গ গ্রন্থ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত।

ব্যাক্তি যন্ত্রনায় বঙ্কিম – সুশীল রঞ্জন মাইতি – পশ্চিমবঙ্গ, বঙ্কিম সংখ্যা।

মেদিনীপুর চরিতাবিধান, মন্মথনাথ দাস।

বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য (আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯১)।