প্রবোধ কুমার বন্দোপাধ্যায় (মানিক বন্দোপাধ্যায়)


Born as Prabodh Kumar Bandhopadhay to Harihar Bandhopadhay and Neeroda Devi, Manik Bandopadhay (1908-1956) is one of the founding fathers of modern Bangla fiction. During a short life of forty years, plagued simultaneously with ailment and financial crisis, he produced forty two novels and more than two hundred short-stories. His important works include Padma Nadir Majhi (The Boatman of Padma River) and Putul Nacher Itikotha (The Tale of Puppet Dance) and Chatushkone (Quadrilateral) Manik Bandopadhay was born on 19 May 1908 in a small town called Dumka in the district of Santal Paragona in the state of Bihar in India . His original name is Prabodh Kumar Bandhopadhay.

মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুলের (জেলা স্কুল) গেটের উল্টোদিকে (ঠিক উল্টোদিকে নয়। মাঠের ধার দিয়ে বিদ্যাসাগর স্মৃতিমন্দিরের দিকে যাওয়ার রাস্তার মুখে) আগে একটি বিশাল অশ্বত্থ গাছ ছিল। সেই গাছের নিচে বসে আপন মনে বাঁশী বাজাচ্ছে ১৭ বছরের একটি যুবক, সঙ্গে সমবয়স্ক কয়েকজন বন্ধু বিভোর হয়ে শুনছে সেই সুর। কখন যে সন্ধে হয়ে গেছে কারুর খেয়াল নেই। হটাৎ একজন বলে উঠল - "মানিক বাড়ি যা, তোর দিদি মনে হয় এতক্ষনে খোঁজা-খোঁজি শুরু করে দিয়েছে।"

হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, সেদিনের সেই যুবকটি 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়' - বাঁশীটা তিঁনি ছোটবেলা থেকেই বাজাতেন। টাঙ্গাইলে থাকার সময়ে স্কুলে না গিয়ে তিনি একা একা মাঠে ঘুরে বেড়াতেন, বাঁশী বাজাতেন। তিনি নাকি খুব ভাল বাঁশী বাজাতে পারতেন। কখনও মাঝিদের সঙ্গে রাত কাটাতেন নৌকায়।

অবিভক্ত মেদিনীপুরের বেশ কয়েকটি শহরে ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাবার বদলির চাকরির জন্য শিক্ষাজীবনটা কেটেছে ঘুরে ঘুরে।কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে বড়দার তত্বাবধানে স্কুল শুরু করলেও, বড়দা চাকরিসূত্রে বদলি হয়ে গেলে তাঁকে বাবার কাছে টাঙ্গাইলে গিয়ে ভর্তি হতে হয়। সেখান থেকে বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি শহরে এসে ভর্তি হন 'কাঁথি মডেল স্কুলে'। সেই সময় তাঁর বড় দিদি থাকতেন মেদিনীপুর শহরে। কাঁথি'র পর তিঁনি আসেন বড় দিদির কাছে, ভর্তি হন জিলা স্কুলে (বর্তমানে মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুল)। এই জিলা স্কুল থেকেই আবশ্যিক ও ঐচ্ছিক গণিতে লেটার নিয়ে, প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তিনি অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার তমলুক, কাঁথি, মহিষাদল, শালবনি ও নন্দীগ্রামে ছিলেন। এরপর বাঁকুড়ার ওয়েসলিশন কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে প্রথম বিভাগে আই.এস.সি. পাশ করে, গণিতে অনার্স নিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবোধকুমার, Manik Bandopadhyay

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ মে (১৩১৫ বঙ্গাব্দের ৬ জ্যৈষ্ঠ) পিতার কর্মস্থল বিহারের সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে তিঁনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে এসিস্ট্যান্ট সেটলমেন্ট অফিসারের সরকারি চাকরি করতেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের নিকট মালবদিয়া গ্রামে। পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের গ্রাজুয়েট। তিনি সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকরি করতেন এবং শেষজীবনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। জন্মের সময় ফুটফুটে সুন্দর কালো শিশু বলে আঁতুড়ঘরেই তাঁর নামকরণ হয় কালোমাণিক। সেই থেকে তাঁর ডাক নাম "মানিক"। মাতা নীরোদাসুন্দরী দেবী, কবির মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ডবল নিমোনিয়ায় ভুগে পরলোক গমন করেন। চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন অষ্টম।

ছোটবেলায় তিনি খুবই দুরন্ত ছিলেন। দুমকায় থাকাকালীন কিছু ঘটনার উল্লেখ করলাম - একবার বঁটিতে পেট কেটে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়েছিল। দাদা সুধাংশুকুমারের পিঠে চেপে আলমারির উপর থেকে ইঁদুর ধরতে গিয়ে আলমারি চাপা পড়ে গিয়েছিলেন। কালীপূজার বাজি তৈরী করতে গিয়ে বারুদভরা শিশি ফেটে আপাদমস্তক ভাঙা কাঁচে বিদ্ধ হয়ে আবার হাসপাতাল। রান্নাঘরে উনোন থেকে চিমটে দিয়ে কয়লা তুলে খেলতে গিয়ে পায়ের উপর পড়ে পুড়ে গেছিল। লুকিয়ে তক্ষুনি নামানো গরম রসগোল্লা মুখে পুরে নিজের সারা মুখ পুড়ে নিয়েছিলেন।

এছাড়াও বহু ঘটনা ঘটিয়েছিলেন ছোটবেলায়।

একবার দুমকায় থাকতে, তাঁর ছোট ভাই ঝুঁকে ব্যাঙ দেখতে গিয়ে কুঁয়ায় পড়ে গিয়েছিলেন। মাণিকের উপস্থিত বুদ্ধি ও বড়দের চেষ্টায় ছোটভাই সে যাত্রায় রক্ষা পান। ছোটবেলায় তিনি শরীরচর্চা করতেন, আখড়ায় গিয়ে কুস্তি লড়তেন। একবার কোন এক গুণ্ডা তাঁর ভাই প্রবোধকে জোর করে লুকিয়ে রেখেছিল | মাণিক সেই গুণ্ডাটিকে নির্দিষ্ট সময় মাঠে আসতে বললেন এবং সেবারের লড়াইয়ে সেই ব্যক্তিকে মার খেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। বরাবরই তিনি স্বভাবে একটু বেপরোয়া ছিলেন। এর জন্য বাড়ীর বড়দের কাছে সাজাও খেয়েছেন প্রচুর।

১৯২৮ সালে কলেজে ছাত্রাবস্থায়,কলেজ ক্যান্টিনে একদিন আড্ডা দেওয়া অবস্থায় এক বন্ধুর সাথে মানিক বাজী ধরেন তিনি তার লেখা গল্প বিচিত্রায় ছাপাবেন। সে সময় কলকাতায় বিচিত্রা পত্রিকা ছিল অত্যন্ত বিখ্যাত এবং কেবল নামকরা লেখকেরাই তাতে লিখতেন। বন্ধুর সাথে বাজি ধরে মানিক লিখে ফেললেন তার প্রথম গল্প "অতসী মামী" এবং সেটি বিচিত্রার সম্পাদক বরাবর পাঠিয়ে দেন। গল্পের শেষে নাম সাক্ষর করেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হিসাবে। পাঠানোর চার মাস পর বিচিত্রায় ছাপা হয় তার লেখা। বিচিত্রা পত্রিকায় (১৯২৮) “অতসী মামী” গল্প প্রকাশের পর সাহিত্য জগতে আলোড়ন দেখা দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নামটি পরিচিত হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে। এরপর থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠাতে থাকেন মানিক। সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশের ফলে তার একাডেমিক পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হয়; শেষাবধি শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে। সাহিত্য রচনাকেই তিনি তার মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন। ২১ বছর বয়সে তাঁর প্রথম উপন্যাস “দিবারাত্রির কাব্য” লেখেন।

চাকরি জীবন শুরু হয় ১৯৩৪ সালে। শুরুতেই কয়েক মাসের জন্য তিনি “নবারুণ” পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৬ সালের মধ্যেই তাঁর লেখা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস "পদ্মানদীর মাঝি" এবং "পুতুলনাচের ইতিকথা" প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

এর পর ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত “বঙ্গশ্রী” পত্রিকার সহসম্পাদক ছিলেন। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি নিজের প্রকাশনা সংস্থা “উদয়াচল প্রিন্টিং এণ্ড পাবলিশিং হাউস” প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সালে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সংস্পর্শে এসে “ন্যাশনাল ওয়র ফ্রন্ট” এ প্রভিন্শিয়াল অর্গানাইজার ও বেঙ্গল দপ্তরে পাবলিসিটি এসিস্ট্যান্টের চাকরি পান। এই চাকরিটি তিনি ১৯৪৩ পর্যন্ত করেন। এরপর তিনি আর কোনো চাকরি করেন নি।

১৯৩৬ সালে কংগ্রেসের লখনৌ অধিবেশনের সময় প্রধানত কমিউনিস্ট বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকদের উত্সাহ ও চেষ্টায় গঠিত হয়েছিল মুন্সী প্রেমচন্দের সভাপতিত্বে “নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ”। পরে প্রগতি লেখক সংঘের বঙ্গীয় শাখার নাম দেওয়া হয় “ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক সংঘ”। মাণিক এই সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৩৮ সালে ময়মনসিংহের গভমেন্ট গুরু ট্রেনিং স্কুলের প্রধান শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সেজ কন্যা কমলা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিয়ের আগে থেকেই তাঁর শরীর ভাল যাচ্ছিল না। পুতুল নাচের ইতিকথা লেখার সময় থেকেই তাঁর মৃগীরোগ ধরা পড়েছিল।

১৯৪৪ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং সাংস্কৃতিক বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জেলা পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। একই বছর অনুষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ববঙ্গ প্রগতি ও লেখক সম্মেলন”, মাণিকের সভাপতিত্বে। “ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক সংঘ" এর নাম বদলিয়ে রাখা হলো "ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ”।

১৯৪৮ সালে বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত হয় “প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন”। এখানে গণসাহিত্য শাখার সভাপতি করা হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ১৯৪৯ ও ১৯৫৩ সালে তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ ও পঞ্চম (শেষ) অধিবেশন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ৪ এপ্রিল প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘ আয়োজিত জোসেফ স্টালিনের শোকসভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন।

ভগ্নসাস্থ্য ও আর্থিক অনটন এই সময় তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৪ তে গিতে তাঁর অবস্থা চরমে ওঠে এবং তাঁর দুরবস্থা নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অতুলচন্দ্র গুপ্তর বাড়িতে সাহিত্যিক ও শিল্পীদের এক সভায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতির উপস্থিতিতে ঠিক হয় যে মানিক বন্দ্যপাধ্যায়ের আর্থিক সাহায্যের আবেন জানানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের ইচ্ছায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার মাসিক ১০০ টাকা পেনশান ভাতা দেওয়া শুরু করেন এবং এককালিন ১২০০ টাকাও তাঁকে দেওয়া হয়। শুরু হয় তাঁর চিকিৎসা। শেষবার তাঁকে ভর্তি করা হয় নীলরতন সরকার হাসপাতালে। সেখানেই ৩রা ডিসেম্বর ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর রচনার মধ্যে চোখে পড়ে বাংলা সাহিত্যে ভাবপ্রবণতার বাহুল্যের ব্যতিক্রমী ও বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গী এবং চরিত্রের বিভিন্ন আচরণের বিশ্লেষণে বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা। “বঙ্গশ্রী” পত্রিকায় চাকরি করার সময় তিনি মার্ক্সীয় দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। বুখানিনের ঐতিহাসিক বস্তুবাদ আর লিয়নটিয়েভের বই থেকে মার্ক্সীয় দর্শনের অর্থনীতি সম্বন্ধে জ্ঞান আহরণ করে নিজেকে মার্ক্সীয় নীতিতে বিশ্বাসী সাহিত্যিক রূপে প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে তাঁর রচনা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে - প্রথম পর্বে দেখা যায় ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের প্রতি ঝোঁক আর দ্বিতীয় পর্বে মার্ক্সীয় দর্শনের প্রভাব। তিনি এক সময়ে লিখেছিলেন -

“আমার বিজ্ঞানপ্রীতি, জাত-বৈজ্ঞানিকের কেন-ধর্মী জীবন জিজ্ঞাসা, ছাত্রবয়সেই লেখকের দায়িত্বকে অবিশ্বাস্য গুরুত্ব দিয়ে ছিনিমিনি লেখা থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি কতগুলি লক্ষণে ছিল সুস্পষ্ট নির্দেশ যে সাধ করলে আমি কবি হতেও পারি ; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক।”

তাঁর বহু রচনার মধ্যে রয়েছে “প্রাগৈতিহাসিক” (১৯৩৭), “মিহি ও মোটা কাহিনী” (১৯৩৮), “সরীসৃপ” (১৯৩৯), "সমুদ্রের খাদ" (১৯৪৩), তেভাগা আন্দোলন নিয়ে লেখা "ছোট বকুলপুরের যাত্রী" (১৯৪৯) প্রভৃতি ছোটগল্প সংগ্রহ এবং “জননী” (১৯৩৫), “শহরতলী” (১ম খণ্ড ১৯৪০ ও ২য় খণ্ড ১৯৪১), “অহিংসা” (১৯৪১), “স্বাধিনতার স্বাদ” (১৯৫১) প্রভৃতি উপন্যাস। "পুতুলনাচের ইতিকথা" (১৯৩৬) এবং "পদ্মানদীর মাঝি" (১৯৩৬) তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা বলে পরিগণিত এবং বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়াও রয়েছে একটি প্রবন্ধ সংকলন, একটি নাটক এবং তাঁর কবিতা।

অরিন্দম ভৌমিক।

midnapore.in