কাজী নজরুল ইসলাম (Kazi Nazrul Islam)

(25 May 1899 – 29 August 1976)


Kazi Nazrul Islam was a Bengali poet, writer and musician and the national poet of Bangladesh. Popularly known as Nazrul, he produced a large body of poetry and music with themes that included religious devotion and rebellion against oppression. Nazrul's activism for political and social justice earned him the title of "Rebel Poet". His compositions form the avant-garde genre of Nazrul Geeti (Music of Nazrul).

কাজী নজরুল ইসলাম | Kazi Nazrul Islam | काज़ी नज़रुल इस्लाम

আজ থেকে ৯৬ বছর আগে ১৯২৪ সালে আজকের দিনেই প্রথম বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মেদিনীপুরে এসেছিলেন। তিঁনি মোট তিনবার মেদিনীপুর জেলায় এসেছিলেন। দ্বিতীয়বার এসেছিলেন ১৯২৫ সালের ১৩ই জানুয়ারি তমলুকে স্বদেশী মেলা উদ্বোধন করতে, সঙ্গে ছিলেন আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও প্রবোধচন্দ্র গুহ রায়। তৃতীয় বার আবার এসেছিলেন মেদিনীপুর শহরে শিল্পপ্রদর্শনীতে ১৯২৯ সালের এপ্রিল মাসে। নাড়াজোল রাজা দেবেন্দ্রলাল খাঁন মেদিনীপুর শহরে অবস্থিত তাঁদের রাজকাছারীতে আয়োজন করেছিলেন ওই প্রদর্শনীর। সন্ধ্যাবেলায় রাজকাছারীর খোলাছাদে গানের জলসায় সবার অনুরোধে তিনি কয়েকটি গজল পরিবেশন করেন। এই জলসায় কবির বন্ধু নলিনীকান্ত সরকার কয়েকটি হাসির গান গেয়েছিলেন। কবির প্রথমবার মেদিনীপুরে আগমন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কারণ পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে মেদিনীপুরেই প্রথম কাজীকে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করা হয়। তারপর বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায়, মহকুমায় বা গ্রামে তাঁকে অভিনন্দন জানান হয়। মেদিনীপুর শহরে যে চারদিন নজরুল ছিলেন সেই কদিনের বিবরণ সংক্ষেপে উল্লেখ করছি।


বিদ্রোহী কবিতাটি ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় এবং সারা ভারতের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ করে। একই বছরের ২৩ নভেম্বর তার যুগবাণী প্রবন্ধগ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং একই দিনে তাকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। যখন বন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন তখন (১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি ২২) বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য গ্রন্থটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। কারামুক্তির পর নানা স্থান থেকে তাঁর ডাক পড়তে থাকে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ মেদিনীপুর শাখার একাদশ বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষ্যে মেদিনীপুর শহরে আমন্ত্রণ জানান হয়। তিঁনি ইংরেজি ১৯২৪ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি (১৩৩০, ১১ই ফাল্গুন), শনিবার মেদিনীপুরে আসেন।

প্রথম দিন (১১ই ফাল্গুন, ১৩৩০)

প্রথম দিন বিকেল ৪টায় মেদিনীপুর সাহিত্য পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। একাদশ বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভারতত্ববিদ ডঃ নরেন্দ্রনাথ লাহা (১২৯৩ - ১৩৭২), অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন নাড়াজোলের ছোটকুমার বিজয়কৃষ্ণ খাঁন। মেদিনীপুর কলেজ ও কলেজিয়েট স্কুলের মাঝখানে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে আরো অনেকে কলকাতা থেকে এসেছিলেন যেমন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ (১৮৬৩-১৯২৭), অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ (১৮৭৭-১৯৪০), প্রেমাঙ্কুর আতর্থী (১৮৯০-১৯৬৪), নরেন্দ্র দেব (১৮৮৮-১৯৭৫), পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় (১৮৯৩-১৯৭৪), শৈলেন্দ্রনাথ বিশী প্রমুখ। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ও অধিবেশনের সভাপতির ভাষণের পর পরিষদের সদস্যদের দ্বারা ক্ষীরোদপ্রসাদের 'প্রতাপাদিত্য' নাটক অভিনীত হয়।

দ্বিতীয় দিন (১২ই ফাল্গুন, ১৩৩০)

দ্বিতীয় দিন (১২ই ফাল্গুন, ১৩৩০) সকাল ৭.৩০ মিনিটে 'কান্ত কবি রজনীকান্ত' -এর লেখক নলিনীরঞ্জন পন্ডিতকে (১২৮৯-১৩৪৭) সংবর্ধিত করা হয়। এই সংবর্ধনা সভায় পৌরোহিত্য করেন ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ। এই উপলক্ষ্যে 'নলিনী-মঙ্গল' নামে ৪২ পৃষ্ঠার একটি পুস্তিকা বেরোয়। এই পুক্তিকায় নজরুল ইসলামের নলিনীরঞ্জন সম্পর্কে একটি কবিতা ছিল। এই সংবর্ধনা সভায় তিনি উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীর অনুরোধে স্বরচিত কয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করে ও গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। অপরাহ্নে পরিষদের পক্ষ থেকে কবিকে অভিনন্দিত করা হয়। অভিনন্দন সভায় সভাপতিত্ব করেন মনীষীনাথ বসু সরস্বতী। পরিষদের কর্মসচিব ক্ষিতীশচন্দ্র চক্রবর্তী পরিষদের পক্ষ থেকে ও কলকাতাবাসীর তরফ থেকে শৈলেন্দ্রনাথ বিশী কবিকে অভিনন্দন পত্র প্রদান করেন। দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল, কিশোরীপতি রায়, অতুলচন্দ্র বসু মেদিনীপুরের পক্ষ থেকে কবিকে অভিনন্দিত করে বক্তৃতা দেন। সবার অনুরোধে সেদিন কবি কয়েকটি দেশাত্মবোধক সঙ্গীত ও 'বিদ্রোহী' কবিতা আবৃত্তি করেন। নজরুল ইসলামের নলিনীরঞ্জন সম্পর্কে কবিতাটি কোন গ্রন্থভুক্ত হয়নি। কবিতাটি হল -

পূজাঞ্জলি

ত্যাগের নলিনী ফুটেছিল কবে দ্বেষ-পঙ্কিল দেশে,

মোহিল চিত্ত সুরভি তাহার পূরবীর বেলা-শেষে।

তারি তরে আজ বানী-বেণুবীণে গলেছে সোহাগ সুধা

আপনার ক্ষুধা মিটেছে যাহার মিটায়ে পরের ক্ষুধা

আপন স্বার্থ বলি দিয়া তারি রক্ত-মাংস-ভারে

রচিল যে জন বাণী-পাদপীঠ বন্দনা করি তাঁরে।

যে দুখ-দগ্ধপ্রাণ দীপ করি জ্বালায়েছ নিজ ভালে,

সেই প্রাণ-শিখা আলো হয়ে আজ জ্বলে এ বরণ থালে।

যে কমল তুলি পূজিয়াছ তুমি বাণীর ভক্ত সবে

কণ্টক-ক্ষত-বক্ষে তোমার তাই মালা হয়ে রবে।

যাহাদের তুমি করেছ মহান, করিবে ভবিষ্যতে,

তাহাদেরি বাণী করে কানাকানি এ-পার ওপার হ'তে।

দুঃখ-দারিদ্রা-সিদ্ধ তাপস! তব তপস্যা-ফলে

বাণীর কমল ভাসিয়া এসেছে তোমার চরণ-তলে।

দেখিব না আজ কে দিল তোমার ললাটে বিজয়-টিকা,

জোতিস্কসম আলো দিবে তব ভাগ্যের দহন-শিখা।

হে স্বার্থ অসহযোগি! যে চরণে দেবতারা দেন হবি-

নাইবা করিল সালাম সে পায়ে, গোলাম জাতের এ কবি!


ভক্তি-প্রণত

- নজরুল ইসলাম


তৃতীয় দিন (১৩ই ফাল্গুন ১৩৩০)

তৃতীয় দিন (১৩ই ফাল্গুন ১৩৩০) মেদিনীপুর কলেজে বিকেল ৪টায় মহিলারা আলাদাভাবে কবির সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন। সভায় কবি স্বরচিত গান ও কবিতা আবৃতি করেন। তাঁর গান ও আবৃতিতে মুগ্ধ হয়ে মেদিনীপুর টাউন স্কুলের শিক্ষক যতীন্দ্রনাথ দাসের মেয়ে কমলা নিজের গলার হার খুলে কবিকে পরিয়ে দেন। তখনকার সমাজ এই ঘটনা স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারে নি। তাঁর নিজের বাবা-মা আত্মীয়স্বজনও বাদ যাননি। সমাজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মেয়েটি নাইট্রিক এসিড পান করে আত্মহত্যা করেন।

সেইদিন সন্ধ্যায় বাংলা স্কুলে (বর্তমান বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠ) এক জনসভায় মেদিনীপুর শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কবিকে অভিনন্দনপত্র দেন। অভিনন্দনের উত্তরে তিনি শুধু কতকগুলি গান গেয়েছিলেন।


চতুর্থ দিন (১৪ই ফাল্গুন ১৩৩০)

চতুর্থ দিন (১৪ই ফাল্গুন ১৩৩০) বিকেল ৫টায় নওরংপুর ডাঙ্গায় অর্ধসমাপ্ত ঈদগা প্রাঙ্গনে একটি সম্বর্ধনা সভা হয়। মৌলবীরা কুরআন শরীফ থেকে আয়েত উদ্ধৃত করে কবিকে আশীর্বাদ জানান এবং তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করেন। ঐ সভায় বিভূতিভূষণ দাস বিদ্যাবিনোদ কবিকে একটি অভিনন্দনপত্র দেন। অভিনন্দন পত্রটি নিম্নরুপঃ-

অভিনন্দন সভায় দেশপ্রাণ সৈনিক কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি ভক্তি নিবেদন

কালকে যখন বন্ধু আমার ছিলে তুমি সভার তলে,

দেবতা দ্বিজ মানুষ পুনঃ “বিদ্রোহী” কেউ বলে,

পরিয়ে দিল পুষ্প মাল্য শ্রদ্ধা আদর করে,

আমি তখন দাঁড়ায়ে দূরে এক কোণে সেই ঘরে।

তোমার বুকের পরশ পেয়ে উল্লাসে সব হাসে,

আমি সেথায় লুকিয়ে লাজে সঙ্কোচে ও ত্রাসে।

ইচ্ছা কেবল হচ্ছিল মোর আকুল আবেশ ভরে,

লুটিয়ে পড়ি, ছুটে গিয়ে তোমার চরণ পরে।

ধন্য কবি জীবন তোমার বাঁধন যাবে খসে।

মুক্তি খুঁজি বন্ধনেতে কারায় যে জন পশে।

হে সন্ন্যাস নিষ্পৃহ বীর, তোমার বাঁচাই বাঁচা,

মৃত্যু দহন, নিত্য মোদের, সোহাগ. সেধে যাঁচা।

সত্য তোমার আত্মদেহের, কর্ম নিয়ম ভাঙা,

ভয় না করা স্বভাব তোমার জুজুর চক্ষু রাঙা।

নমস্য কেউ নয়ক তোমার, তুমিই তোমার রাজা,

ভুল করে সব মূর্খেরা যায় তোমায় দিতে সাজা।

তোমায় বড় করতে যাওয়া, বাজে কথাই বকা,

বড় ছোটর গণ্ডী তুমি এগিয়ে গেছ সখা।

আসিনি ভাই তোমায় দিতে, নেইক দেবার কিছু,

তোমায় শক্তি দিক আমাদের টেনে তোমার পিছু।

আজ দ্বিধায় পারি না করতে যেসব কাজ,

তোমার পায়ের স্পর্শে, 'পাষাণ' মূর্তি ধরুক আজ।


সোমবার, ১৩ই ফাল্গুন ১৩৩০, মেদিনীপুর।

- কবিবন্ধু, শ্রীবিভূতিভূষণ দাস।


সেই চারদিন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা এবং শহরের বিশিষ্টজনেরা নজরুলকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে অভার্থনা জানিয়েছিলেন। মেদিনীপুর শহর কবির প্রতি যে হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা দেখিয়েছিল তা সম্ভবত তৎকালীন সময়ে আর কোথাও দেখা যায়নি। সবাইকে আত্মীয় করে নেওয়া নজরুলচরিত্রের একটি বিশেষ গুণ। তিনি এখানে যে কদিন ছিলেন সে কদিন যেন তিনি মেদিনীপুরের একান্ত আপনজন হয়ে পড়েছিলেন। মেদিনীপুরবাসীর প্রীতি সম্পর্ক ও সেদিনকার জাতীয়তাবাদী চেতনায় মুগ্ধ হয়ে “ভাঙার গান" (১৩৩১ শ্রাবণ, আগষ্ট ১৯২৪) মেদিনীপুরকে উৎসর্গ করে মেদিনীপুরবাসীর সঙ্গে এক অচ্ছেদ্য প্রীতি-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন (“ভাঙার গান' ১৯২৪ সালের ১১ই নভেম্বর সরকার বর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়)।


- অরিন্দম ভৌমিক।

midnapore.in


তথ্যসূত্র :-

১) নজরুল ইসলাম - আজহারউদ্দিন খাঁন।

২) মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুল।

৩) মেদিনীপুর টাউন স্কুল।

৪) তমলুক পৌরসভা হ্যান্ডবুক।

৫) নাড়াজোল রাজবাড়ী (অরিজিৎ খাঁন / সন্দীপ খাঁন)।

৬) কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা - জাফফর আহমদ।