পিতৃ-স্মৃতি
Freedomfighter Basantakumar Das
প্রকাশকান্তি দাস।
Home » Medinikatha Journal » Prakash Kanti Das » পিতৃ-স্মৃতি
বাবাকে কীভাবে দেখেছি, কী অনুভব করেছি, তারই কিছু স্মৃতি, কিছু কথা তুলে ধরার চেষ্টা যা একান্ত আমার।
আমরা পাঁচ ভাই ও এক বোন। শুনেছি আমাদের আর এক ভাই ছিল। সে অল্প বয়সে মারা যায়। আমার বড় জ্যাঠামশাই, ক্ষীরোদচন্দ্র ছিলেন কাঁথি কোর্টের নামকরা উকিল। বাবা গ্রামের (রামচক) প্রাইমারি স্কুল থেকে পাশ করে প্রথমে কাঁথি মডেল স্কুলে, পরে কাঁথি হাইস্কুলে ভর্তি হন। থাকতেন জ্যাঠামশায়ের কাছে। পড়াশুনো চলত তাঁর তত্ত্বাবধানে। মেধাবী ছাত্র হিসাবে সুনাম ছিল। সাফল্যের সঙ্গে প্রথম বিভাগে মেট্রিকুলেশন পাশ করে কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজে ১৯১৪ সালে ১৬ বছর বয়সে যোগ দিলেন বিজ্ঞান বিভাগে (ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্সে)। অনেক সহপাঠীর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘প্রফুল্লচন্দ্র সেন’---যিনি পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায় কীভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে জড়িয়ে যান তা বিশদভাবে জানা নাই। তবে সে সময়টা ছিল (১৯১৫-১৯১৮ সাল) জাতীয় আন্দোলনে উত্তাল। বাংলায় আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তার পুরোভাগে চারিদিকে পরাধীনতা বন্ধন মুক্তির আকুলতা। স্বাভাবিকভাবে ছাত্র সমাজকে আবেগতাড়িত করবেই। ধরে নেওয়া যেতে পারে বসন্তকুমার (বাবা) তাদেরই একজন। পরবর্তী ইতিহাস যেমন রোমাঞ্চকর তেমন কৌতূহল ও শিহরণন জাগান। এলেন বিপ্লবীদের সংস্পর্শে অনুশীলন সমিতির মাধ্যমে। তখন তিনি বি.এসসি-র ছাত্র। সাল ১৯১৬, বয়স সবে ১৮। মেছুয়া বাজারের বোমার মামলায় জড়িত সন্দেহে দুই বছরের জন্য রাজশাহীর জেলে (অধুনা বাংলাদেশ)। শুধু তাই নয়, হলেন কলেজ থেকে বহিষ্কৃত। জেল থেকে বেরিয়ে রামচক গ্রামের বাড়িতে অন্তরীণ থাকাকালীন ২০ বছর বয়সে তাঁর বিবাহ বৃন্দাবনচকের শ্রীমতী তরঙ্গিণী দেবীর সঙ্গে। গ্র্যাজুয়েশন সেই সময় সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে। ঘটল পথ ও মত পরিবর্তন। যোগ দিলেন কংগ্রেসে। হলেন গান্ধীবাদী অহিংস সত্যাগ্রহী। বয়স তখন ২২/২৩ বছর। পরবর্তী ২৩/২৪ বছর গান্ধীজির নেতৃত্বে তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকায়। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার কারাবাস। তাঁর যৌবনের ১০ বছরের উপর কারান্তরালে অতিবাহিত। উল্লেখযোগ্য টানা তিন বছর বিনা বিচারে কারাবাস আলিপুরের প্রেসিডেন্সি জেলে (কলকাতায়) ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে। জেলের ছবি আবছা হলেও আমাকে এখনও নাড়া দেয়। তখন কতই বা আমার বয়স। বছর পাঁচেকের কাছাকাছি হবে হয়তো। মায়ের হাত ধরে জেলের দরজায়। সময় দেওয়া আছে বাবার সঙ্গে দেখা করবার। কিছুক্ষণ বাদে লম্বা চওড়া এক গোরা সাহেবের হুংকার---‘সময় শেষ, এবার যেতে হবে।’ গোরা সাহেবের ছবিটা এখনও চোখ বুজলে দেখতে পাই। কী ভয়ই না করেছিল। এমন কিছু জিনিস ঘটে যা কখনওই মন থেকে মুছে যায় না।
বসন্তকুমার (দাস)
আমরা থাকি কাঁথিতে খড়ের ছাওয়া দোতলা এক বাড়িতে ‘থানাপুকুরে’র পাড়ে। পাড়াটা জমিদার পাড়া হিসেবে পরিচিত। কারণ---‘জানা’, ‘দিন্দা’, ‘শাসমল’ এইসব বিত্তশালীদের অট্টালিকা চারিদিকে। তার মাঝে আমাদের বাড়িটা ছিল বিশ্রীরকম বেমানান। শুনেছি বাবার সহৃদয় বন্ধু ও সহকর্মীরা বাড়িটা আমাদের জন্য ঠিক করে দেন বাবার জেলে থাকা অবস্থায় যাতে করে আমাদের এক স্থায়ী আস্তানা হয়। শুধু তাই নয় ,পুলিশের চোখ এড়িয়ে লুকিয়ে সেই সব সাহসী ও দরদি বাবার সহকর্মী ও বন্ধুরা সাহায্য করতেন নানাভাবে আমাদের কষ্টের সংসারকে সামাল দেবার জন্য। আর মাকে দেখতাম চরকা কাটতে। সন্ধ্যা হয়ে এলেও বিরাম নাই। মার হাতে কাটা সুতোর খদ্দরের জামা পরেছি। এত টানাপোড়েনের মাঝেও একটা চাপা গর্ব ছিল। বাবা দেশের মুক্তির জন্য লড়ছেন। আর তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীরা আমাদের সাহায্য করছেন শুধু ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার তাগিদে। তাঁদের বাবার প্রতি অবিমিশ্র অকুণ্ঠ স্বার্থহীন ভালোবাসা।
সাল ১৯৪৫ কিংবা ’৪৬-এর গোড়ার দিক। চারিদিকে আনন্দ উৎসবের ছোঁয়া। আমাদের কাঁথির বাড়ি যাবার একটা ঢালু পথ আছে। আবছা আবছা মনে পড়ে সেই পথের দুধার সাজানো দেবদারু গাছের পাতা দিয়ে। বাবা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে কাঁথি আসছেন। আনন্দ ও গর্ব দুইই আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি ইজের (দড়ি দিয়ে কোমরে বাঁধতে হয়, প্রায় প্যান্টের মতো) পরে হাফহাতা এক খদ্দরের জামা গায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছি। কী এক অদ্ভুত আনন্দ! জীবনে আর তা কোনোদিন পেলাম না। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হল বাবার জেলমুক্তির প্রায় এক দেড় বছর বাদে। ভারতের সংবিধান তৈরি হবে। ‘Constituent Assembly’-র নির্বাচিত সদস্যরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিল্লিতে সমবেত হয়েছেন। বাবা সেই সদস্যমণ্ডলীর একজন। বাবার দিল্লির ঠিকানা হল---৭নং ইলেকট্রিক লেন, হোটেল ‘জনপথ’-এর উলটো দিকের রাস্তা। বর্তমানে হোটেলটি আর নেই। পরবর্তীকালে বহুদিন আমার ওই ঠিকানায় কেটেছে। সাল ১৯৪৮। আমরা বাবার সঙ্গে দিল্লিতে। বাবা সকাল দশটার মধ্যে বেরিয়ে যান। ফিরতে ফিরতে সন্ধে পার হয়ে যায়। সেদিনের সেই দিনটা মনে পড়লে ভিতরটা কেমন অশান্ত হয়ে ওঠে। বাবা ফিরে এসে হলঘরে খাবার টেবিলে মাথা নিচু করে বসে। সঙ্গে আরও দুজন। আস্তে আস্তে আরও কয়েকজন এসে বসলেন। কারও কোনো কথা নেই। চারিদিকে এক গভীর নিস্তব্ধতা। বাবার মুখ থেকে দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে এক অস্ফুট, প্রায় না শোনার মতো কথা---‘সব শেষ হয়ে গেল।’ এসব বোঝার বয়স আমার ছিল না। বাবা মাকে বলছেন---‘গান্ধীজি আর নেই।’ সেই নিস্তব্ধতা ও শূন্যতার মাঝে ভাষাহীন সব বয়স্কদের ভিড়ে অবাক বিস্ময়ে বসে আছি আমি। আস্তে আস্তে উঠে গেলাম পেছনের দরজা দিয়ে বাগানে। সেখানে এক ঝাঁকড়া পাতিলেবুর গাছ ছিল। আনমনে পাতা ছিঁড়তে লাগলাম। আর কিছু মনে পড়ে না।
সেইসময় ছোটবেলার এক ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারিনি। চোখ বুজলেই প্রায়ই ছবিটা বিশ্রীভাবে লাফালাফি করে। আমি ছিলাম ছোটবেলায় খুবই দুরন্ত। রেখে গেলে হাতের কাছে যা পেতাম ছুঁড়ে মারতাম। বাড়িতে তখন অনেক পড়ুয়া থাকত। তাদের বেশিরভাগ আমাদের গ্রামের কিংবা আত্মীয়। বাবা মা চাইতেন তারা শিক্ষিত হয়ে উঠুক। তাই এই চেষ্টা। তখন অবশ্য বাবা ভারতীয় রাজনীতিতে এক স্বীকৃত ব্যক্তিত্ব। ‘Constituent assembly’-র সদস্য। বাড়ির ছোট ছেলে হিসাবে সবার আশকারা পেতাম একটু বেশি করে। সবাই আমার দুরন্তপনা গায়ে মাখত না। সেবার একটু বেশি রকম বাড়াবাড়ি হয়ে গেল। আমার ঠিক উপরের দাদাকে রেগে গিয়ে ঢিল ছুঁড়ে মেরেছি। আর রক্তপাত। বাবা স্নানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তাঁর চোখে পড়ল ব্যাপারটা। তিনি আমার কান ধরে বললেন---‘বদমাশ ছেলে কোথাকার।’ ওইটুকু আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। আর কখনও ওই ধরনের দুষ্টুমি করিনি। বাবাকে জীবনে আর কখনও রাগতে দেখিনি। এমনকি খুব চড়া গলায় কারওর উপর কথা বলতে শুনিনি। ওনার ব্যাপারটা ছিল বুঝিয়ে সবকিছু মিটিয়ে দেওয়া। রাগকে সংযত করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল। চাইতেন তাঁকে দেখে আমরা যেন সেইভাবে নিজেদের চালাতে পারি।
বাবা তখন প্রথম লোকসভার নির্বাচিত সদস্য। সালটা ১৯৫২। আমি, ছোট বোন আর মা এসেছি বাবার কাছে দিল্লিতে। ঠিকানা সেই ৭নং ইলেকট্রিক লেন। তখনকার দিল্লি আর আজকের দিল্লি আসমান জমিন ফারাক। তখন ছিল সাইকেল আর টাঙ্গার দিল্লি। অফিস ছুটির সময় দেখতাম কাতারে কাতারে সাইকেল চলেছে। আর ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা---জিনিসপত্র চাপিয়ে চলেছে গোটা পরিবার। সেই সময় ঘটেছিল আমার এক বিপত্তি। সেই বয়সে কৌতূহল অদম্য। সকালে কাউকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। রাস্তায় লোক, গাড়ি, বাড়ি দেখতে দেখতে হেঁটে চলেছি। অনেক পথ চলে এসেছি। খেয়াল হল বাড়ি ফেরার। কিন্তু রাস্তা গেছে গুলিয়ে। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। হিন্দি তেমন জানি না। সাহস করে ট্রাফিক পুলিশের কাছে হাজির হলাম। তাকে আমার জানা হিন্দি দিয়ে যতই বোঝাই সে কিছুই বোঝে না। বাড়ির ঠিকানাও ঠিকভাবে হিন্দিতে বলতে পারছি না। শেষপর্যন্ত আবার হাঁটা। ইতিমধ্যে বাড়িতে হইচই। মা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। বাবার পরিচিত নন্দকাকু (মুগবেড়িয়ার নন্দ) শেষপর্যন্ত কার্জন রোডের মোড় থেকে আমাকে আবিষ্কার করে নিয়ে এলেন! গোটা বাড়ির সবার উদ্বেগ দেখে আমার তো কান্না আসার জোগাড়। আমার কথা শুনে বাবা ধীরে ধীরে বললেন হিন্দি বলাটা রপ্ত করতে। তারপর আমাকে স্বাভাবিক করতে সবাই একটু হাসি মশকরা করল। আর আমি আমাদের রান্নার লোক (হিমাচল থেকে আসা) তার সঙ্গে শুরু করলাম হিন্দিতে কথা বলা। শুরুটা আবোল তাবোল হিন্দি হলে কী হবে, পরে এক মাসের মধ্যে চলনসই হিন্দিতে রপ্ত হয়ে গেলাম। একদিন আমি, বোন, মা ও বাবা খাবারদাবার সঙ্গে নিয়ে টাঙ্গায় চড়ে রওনা হলাম সকালে কুতুবমিনার দেখতে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। আমরা সবাই ক্লান্ত। ঠান্ডা পড়েছে খুবই। সময়টা ছিল ডিসেম্বর। আমি শীতে জবুথবু। কোনোরকমে খেয়ে নিয়ে লেপের তলায়। ঘুম ভাঙল যখন, দেখি বাবা হনুমান টুপি পরে মোটা চাদর জড়িয়ে লেখালেখির কাজে মগ্ন। লেপের মধ্যে বসে রইলাম। ঘরে আলো জ্বলছে। তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। আমার উপর ভার পড়ল কুতুব মিনার ভ্রমণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ ইংরেজিতে লেখার। লিখেও ফেললাম আমার মতো করে। সুন্দরভাবে correction হল। গ্রামার কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে তা বুঝলাম। বাবার ইংরেজি ছিল অদ্ভুত ভালো। ছোট ছোট ইংরেজি বাক্য কেমন করে সাজাতে হয়, তা এমন করে আর কেউ বোঝায়নি। বহু বছর পরে মার শ্রাদ্ধবাসরে (বাবা তখন গত হয়েছেন) জনৈক কাঁথি কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক একান্তে আমাকে বলেছিলেন---তাঁরা ইংরেজির যে কোনো Draft করতে বাবার কাছে আসতেন। আরও যখন বড় হয়েছি, তখন দেখেছি দিল্লির বাড়িতে অনেক রাজনীতিতে যুক্ত ব্যক্তি বাবার কাছে আসতেন ইংরেজি লেখা মুসাবিদা করতে। খুব কম বয়স থেকে আমার ইংরেজি শেখার যে উৎসাহ তার বাবার কাছ থেকে পাওয়া। ছোটবেলা থেকে ইংরেজি কাগজ (বিশেষ করে Statesman) পড়ার উৎসাহ পেতাম বাবার কাছ থেকে। পড়ে যে সব বুঝতাম তেমন নয়। সময় থাকলে অনেক সময় বাবা বুঝিয়ে দিতেন। বলতেন পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে বোঝা সহজ হবে। মনে আছে এক পকেট সাইজ Dictionary বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলাম। বহুদিন সেটা আমার সঙ্গী ছিল। একবার বাবার Telegram পোস্ট করতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে বলেছিলাম, একটা শব্দ বুঝতে পারছি না। এখনও মনে আছে, শব্দটা ছিল---wire me. তখন সম্ভবত ফোর ফাইভে পড়ি। বাবার কাছ থেকে শিখলাম কী করে খুব ছোট করে লিখতে হয় Telegram করতে গেলে। এবারে দিল্লি আসায় আমার আর একটা অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ ঘটে। বাবার জনৈক বিজ্ঞানী বন্ধুর অনুরোধে আমরা সবাই গেলাম Pusa Instituteএ পূর্ব প্যাটেল নগরে। তখন অবশ্য এটা ছিল দিল্লি শহরের বাইরে প্রায় গ্রাম্য পরিবেশের মধ্যে। সন্ধ্যার পর লোকজন গাড়ি-ঘোড়া প্রায়ই দেখা যেত না। এটি ছিল কৃষি বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞান লাভের কেন্দ্র। দেখলাম ছাত্ররা মাঠে কাজ করছে। আমি জেনেছিলাম এরা সব পরীক্ষা দিয়ে এখানে পড়তে এসেছে। সবাই এখানে পড়ার সুযোগ পায় না। অবাক হয়েছিলাম। চাষের কাজে এমন কী আছে যা পড়তে হলে পরীক্ষা দিয়ে আসতে হয়, এসব বোঝার ক্ষমতা আমার তখন ছিল না। কিন্তু বাবাকে দেখলাম গভীর আলোচনায় ব্যস্ত ও নানা তথ্য সংগ্রহ করছেন। বুঝলাম, বিষয়টা মোটেই সাদামাটা নয়। মজার কথা হল সেই আমি অনেক বছর পরে এখানে এলাম ছাত্র হিসাবে। বাবার উৎসাহে যে এ ব্যাপারে কাজ করেছিল তার কথা পরে বলব।
এরপর আরও দু-তিন বছর কেটে গেছে। আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। বাবা রাশিয়া গেলেন ভারতীয় সংসদীয় দলের নেতা হিসাবে। সেখানকার কৃষি ব্যবস্থা বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভের জন্য---যা ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থায় কার্যকরী হতে পারে। সালটা ১৯৫৬। ওখান থেকে আসার পর কাঁথিতে কয়েকটি জায়গায় বাবাকে বলতে হয়। বিষয় ছিল, যতদূর মনে পড়ে, রাশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা ও সমাজ চিত্র। বাবা ওদের সমাজ ব্যবস্থাকে তেমন করে পছন্দ করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল ভারতীয় সমাজে ওই ব্যবস্থা গ্রহণীয় নয়। বিশেষ করে বয়স্ক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতি ওখানকার সমাজের নামমাত্র দায়িত্ব ওনাকে আহত করেছিল। সব কিছু দেওয়া নেওয়া, হিসেব নিকেশ দিয়ে মাপা যেখানে হৃদয়ের অনুভূতির মূল্য অল্পই তা কোনোভাবেই সমাজের পক্ষে হিতকর নয়। আর সমস্ত কিছু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী মঙ্গলজনক নয়, তা তাঁর বিশেষভাবে মনে হয়েছিল।
সাল ১৯৫৮। আমি কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজের আই. এসসি-র ছাত্র। বাবা তখন পশ্চিবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য। কাঁথির বাড়িতে থাকার সময় পান অনেক বেশি। তবে তাঁর নাগাল পাওয়া সহজ নয়। কাঁথির কংগ্রেসের সংগঠন শক্তিশালী করার কাজে অনেক বেশি ব্যস্ত। লোকজন আসার বিরাম ছিল না। তারই ফাঁকে এক সন্ধ্যায় বাবাকে পেলাম কিছুটা ঘরোয়া মেজাজে। জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কী পড়ছি। কেমিস্ট্রির বই থেকে হাইড্রোজেন প্রস্তুত বিষয়টি মুখস্থ করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি। কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। সব দেখে ওনার বক্তব্য, বিষয়টি আগে ভালো করে বোঝা উচিত? তারপর সবকিছু মনে থাকবে। গোটা বিষয়টি তিনি প্রাঞ্জলভাবে বোঝালেন। ‘Nascent Hydrogen’-এর মানে বোঝালেন। দেখলাম সবটা সহজভাবে মনে রাখা আর কষ্টসাধ্য হল না। ভাবছি কতকাল আগে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে তিনি বিষয়গুলি পড়েছেন। এখনও তা মলিন হয়নি। একেই বলে মেধা ও অনুশীলনের উৎকর্ষতা। জীবনে এই শিক্ষা পরবর্তীকালে গুরুগম্ভীর বিষয়কে বোঝা ও অনুধাবন করার প্রচেষ্টাকে সার্থক করেছে। ভালো ও কৃতী শিক্ষকের এমনতরো গুণাবলি অর্জন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
বসন্তকুমার (দাস)
বাবা ক্রমশ দেশের ও সমাজের কাজে গভীরভাবে জড়িয়ে গেলেন। প্রায়শই নানা জায়গায় যেতে হত। তাছাড়া বিভিন্ন কমিটির সদস্য কিংবা সভাপতি হয়ে নানা দায়িত্বপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়লেন। উদ্বাস্তু সমস্যা ও পুনর্বাসন সমস্যা সমাধানে বিশেষ করে তাঁকে সময় দিতে হত। কখনও দণ্ডকারণ্য, কখনও বা আন্দামান ইত্যাদি জায়গায় দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। সেই সঙ্গে নিজের এলাকার দেখভাল তো ছিলই। সব কিছু নিয়মমাফিক করে যেতেন। বাড়িতে যতক্ষণ, ততক্ষণ লোকের ভিড়, হাজির হত নানা সমস্যা নিয়ে। কত লোক যে বাড়িতে পাত পাড়ত তার ইয়ত্তা নেই। মা কোনো অনুযোগ না করে সবকিছু সামাল দিয়ে যেত। আমরা সেই জনতার ভিড়ে বাবাকে তেমন করে কাছে পেতাম না। বাবা ঘটনাচক্রে বাড়ির অন্যতম এক অতিথি হয়ে গেলেন। তবু যখনই যতটুকু সময় পেয়েছেন বাড়ির কাজে যোগদান থেকে বিরত হননি। ইতিমধ্যে আমার দুই দাদার বিয়ে হয়েছে। সংসার ভারী হয়েছে। বাবার উপর অতিরিক্ত চাপ বেড়েছে। খরচের বহর ঊর্ধ্বমুখী। বাবাকে তার সিংহভাগ বহন করতে হত। কোনো অনুযোগ আমরা শুনিনি। অমানুষিক পরিশ্রম দিয়ে আর অভূতপূর্ব ধৈর্য সহকারে তিনি সব কিছু সামাল দিয়ে যেতেন যাতে কারওর গায়ে আঁচড়টি না লাগে। আমি প্রথম বিভাগে আই. এসসি পাশ করেছি কাঁথি প্রভাতকুমার কলেজ থেকে; চেষ্টা করছি উচ্চতর শিক্ষার জন্য কোনো ভালো জায়গায় ঢোকার। আমার ইচ্ছে ডাক্তারি পড়ার। নম্বর যা ছিল তাতে তেমন অসুবিধে হবার কথা ছিল না admission পাবার। দুর্ভাগ্যবশত বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কাঁথির ডাক্তারের পরামর্শে (বিশেষ করে ডা. অনাথ দাস) বাবাকে কাঁথি থেকে কলকাতায় আনতে হল। নানা চিকিৎসা চলার পর ডাক্তারদের আশঙ্কা হল ক্যান্সার জাতীয় কোনো মারণ রোগ বাসা বেধেছে। বায়োপসি হল। আমাদের সবার উৎকণ্ঠার শেষ নেই। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসছে দেখা করতে। বাবার শারীরিক কষ্ট ও দুর্বলতা সত্ত্বেও সমান তালে সবার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে। মা’র চিন্তার শেষ নাই, দাদাদের দিকে তাকিয়ে, কখন বায়োপসির রিপোর্ট আসে সেই আশঙ্কাকে নিয়ে। শেষমেশ report এল। ক্যান্সারের কিছু ধরা পড়েনি। ‘Acute form of piles’ বলে স্থির হয়েছে। তারই চিকিৎসা চলল। বাবা আস্তে আস্তে সুস্থ হতে লাগলেন।
ইতিমধ্যে ডাক্তারি কলেজে ঢোকার তারিখ শেষ। ডাক্তারি পড়া আর হল না। সেই সময় কাগজে দেখলাম State Agriculture College-এ স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হবার আবেদনপত্র চেয়েছে। বাবার উৎসাহে দরখাস্ত জমা দিলাম। যথাসময়ে ইন্টারভিউয়ের ডাক। যেতে হবে হরিণঘাটায়। হাজির হলাম। Interview Board-এর মুখোমুখি। প্রশ্নগুলো খুব কঠিন নয়। স্বচ্ছন্দে উত্তর দিতে পারছি। হঠাৎ Board-এর একজন আমার দরখাস্তের এক জায়গায় দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন পিতা বসন্তকুমার কী করেন? বললাম; উনি স্বাধীনতা সংগ্রামী। উনি লাফিয়ে উঠলেন, বললেন---‘তুমি বসন্তবাবুর ছেলে। তোমার কথা তো তিনি কিছু বলেননি। বরং আর একটি ছেলে Veterinary-তে ভর্তি হতে চায় তার কথা বলেছিলেন---।’ আমতা আমতা করে বললাম---‘বাবা জানেন না আমি এখানে দরখাস্ত করেছি---। তিনি শুধু শব্দ না করে হাসলেন। পরে জেনেছি তিনি ছিলেন পশ্চিমবাংলার কৃষিমন্ত্রী। বাবা কখনওই নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য সুপারিশ করেননি। তার পদমর্যাদার কোনো সুযোগ সুবিধে গ্রহণ করেননি। স্বজনপোষণ নীতিকে সব সময় দূরে সরিয়ে রেখেছেন। চারিদিকে যে ঘটনা দেখতে আমরা প্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি, তার মাঝে তিনি ছিলেন এক বিরল ব্যতিক্রমী। লোকে বলবে (হয়তো বা) তিনি সুযোগসন্ধানী ছিলেন না। আমার মনে হয় এইসব ব্যতিক্রমী লোকদের জন্য (যদিও তাদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে) সমাজটা চলছে, খুঁড়িয়ে চললেও।
ভাগ্যবিধাতার কী অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। কৃষিতে স্নাতক হয়ে সেই আমি, যে কিনা কৃষিতে পড়ার কী এমন আছে বলে বিস্মিত হয়েছিল একদিন, দুধাপের Interview দিয়ে Pusa Institute-এ (যার কথা আগে বলেছি) দিল্লিতে ভর্তি হয়েছি সর্বভারতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এম. এসসি পড়ার জন্য। সালটা হল ১৯৬২। Hostel-এ থাকি। বাবা তখন তৃতীয় লোকসভার সদস্য। ঠিকানা সেই ৭নং ইলেকট্রিক লেন। মাঝেমধ্যে Hostel থেকে সাইকেল চালিয়ে আসি। একবার বাবার কাছ থেকে পাশ পেলাম ২৬ জানুয়ারির (প্রজাতন্ত্র দিবস) সব অনুষ্ঠান দেখার। ইলেকট্রিক লেনের বাড়িতে সাইকেল রেখে হেঁটেই চলে গেলাম পার্লামেন্ট পার হয়ে ‘রাজপথে’। চারিদিকে ব্যারিকেড করা। পাশ দেখিয়ে ঢুকলাম। দু একজন চেনা মুখ পেলাম। অনুষ্ঠানের শেষে ফিরলাম প্রচণ্ড ভিড় ভেঙে, তখন প্রায় দুপুর একটা। খুব ক্লান্ত। খেয়েদিয়ে একটা ঘরে শুয়ে পড়লাম জামা প্যান্ট পরা অবস্থায়। ঠান্ডা লাগছিল। হাঁটু দুটো বুকের কাছে নিয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছি, যাতে করে ঠান্ডা কম লাগে। আধো জাগা আধো তন্দ্রার মাঝে দেখলাম বাবা কম্বল এনে আমার গায়ে জড়িয়ে দিচ্ছেন। আর আমি আরাম করে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে রইলাম। বাবা যে কেবলই বাবা, জন নেতার কোনো আবরণ আর নেই, সেই অনুভূতি আমাকে আবিষ্ট করে রাখল। ঘুম ভাঙার পরও কীসের এক সুমিষ্ট আবেগ আমাকে জড়িয়ে রইল। বাড়ির অতিথি বাবাকে অন্যরূপে পেলাম।
পুষা ইন্সটিটিউটে (আই এ আর আই) আমার ছাত্র জীবন কেটেছে ৬ বছর। M.Sc. ও Ph.D করা হল। ওই সময়টা চুটিয়ে উপভোগ করেছি। খেলাধুলা, নাটক, পড়াশোনা সমানতালে চলেছে। এত গুণীজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন যে বলার নয়। দিল্লির নামজাদা সব বাঙালি যাঁরা নানা পেশায় যুক্ত তাঁদের সংস্পর্শে আসতে সুযোগ পেয়েছি ওই ৭নং ইলেকট্রিক লেন-এ বাবার দৌলতে। ধীরে ধীরে সেই সবকিছু আমাকে বাংলার গণ্ডি থেকে সর্বভারতীয় স্তরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে। আর সর্বভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক কিছু জানবার ও বুঝবার সুযোগ পেয়েছি। একটি স্থির সিদ্ধান্ত আমাকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। যা হল আমাদের মেধা (যা নিয়ে আমাদের গর্বের অন্ত নাই) কঠিন পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হলে আমাদের সাফল্য আকাশচুম্বী হবে। মেধা, পরিশ্রম ও অনুশীলন এই ত্রয়ীর মেলবন্ধন চাই। আর এই সংযোগের ক্রিয়াকলাপে বাবাই ছিল আমার আদর্শ। চোখ বুঝে যখন নিজের ভিতরের প্রশ্নগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করি তখন একটা উত্তরই ভেসে ওঠে---তা হল কোনো জাদুমন্ত্র নয়। গ্রাম্য জীবনের অবহেলিত সামাজিক স্তর থেকে যে ব্যক্তি যার নাম বসন্তকুমার এই উচ্চতাকে স্পর্শ করতে পেরেছে, সর্বভারতীয় স্তরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে তা কেবল সম্ভব জীবনে এই ত্রয়ী প্রচেষ্টার মহামিলনে।
বাবা তখন প্রায় ৭২ ছুঁই ছুঁই। বিয়ের পর স্ত্রীকে রেখে আমি চলেছি বিলেতে। নূতন কিছু গবেষণা শুরু করব ওখানে। বিলেতে কাটল প্রায় তিন বছর। স্ত্রী বিলেতে এসেছেন আমি আসার কিছুদিন পরে। পিতা হয়েছি এক পুত্রসন্তানের। দুর্ভাগ্যবশত মেনেনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তার ব্রেনের খুব ক্ষতি হয়। বিলেতে অপরেশন সত্ত্বেও বিশেষ কোনো উন্নতি হয়নি। সে ক্রমশ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। তার নার্ভগুলিতে আস্তে আস্তে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রকার পারিবারিক প্রতিকূলতার মধ্যে চলতে হচ্ছে। স্থির করলাম দেশে ফেরার, যদিও আমার প্রফেসর (যার কাছে বিলেতে কাজ করছিলাম) আফ্রিকার এক দেশে বিরাট টাকার চাকরির ব্যবস্থা করেছিলেন। ভেবেছি দেশে সবার মাঝে থেকে ছেলের সমস্যাগুলো সবাই মিলে ভাগ করে নেব। আর আমার গবেষণার কাজও তখন সহজ হবে। বাবার হার না মানা জেদটা ভেতরে ভেতরে অনুভব করছিলাম। পালাম Airport-এ নভেম্বরের এক দুপুরে নামলাম। দেখলাম বাবা দাঁড়িয়ে। এসেছেন বাড়ির থেকে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য। তখন তিনি দিল্লিতে থাকেন না। প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। প্রায় ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধ তাঁর ছেলে বউমার জন্য ছুটে এসেছেন ভরসা ও সাহস দেবার জন্য। এই দৃশ্যে আবেগ তো থাকবে। তার চেয়ে বড় কথা মনের সাহস শতগুণ বেড়ে উঠে। যে কোনো সন্তানের কাছে এ বিরাট পাওয়া।
এরপর ঘটনাবহুল সময়গুলোত কেটেছে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে। বাবা তখন নিবিড়ভাবে ব্যস্ত ‘মেদিনীপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস’ রচনায়। ওই বয়সে মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামে চলেছেন খবর সংগ্রহ করতে। কখনও হেঁটে, কখনও সাইকেলরিকশায় দু-একজন কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে চড়া রোদ মাথায় করে এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে ঘুরছেন। লক্ষ্য তথ্যনির্ভর অভিজ্ঞতাকে লিপিবদ্ধ করা। সে সময় থাকতেন কলকাতায় মেজদাদার বাসায়। আর মেদিনীপুরের ইতিহাস রচনা জন্য ভাড়া করেছেন একটা ঘর কাছেপিঠে। আমার তখন অস্থায়ী আস্তানা কলকাতায় শ্বশুর বাড়িতে। বাবাকে দেখছি সকাল থেকে ব্যস্ত লেখার কাজে। দু-একজন সাহায্যকারীর সঙ্গে। দুপুরে খাওয়ার পরে একটু বিশ্রাম। আবার হাজির হওয়া ভাড়া বাড়িতে ইতিহাস লেখাতে। সন্ধ্যার চা সঙ্গে বিস্কুট কিংবা মুড়ি ওখানে বসেই সবার সঙ্গে খাওয়া। তারপর আবার লেখার কাজে লেগে যাওয়া, চলতে থাকে রাত ৯টা পর্যন্ত। এটাই ছিল বাঁধাধরা নিয়ম। এর কোনো অন্যথা হত না। বাবার ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর’ প্রথম খণ্ড বেরিয়েছে। আমি সেই সময় Visiting Scientist হিসাবে আমেরিকা যাবার সুযোগ পেলাম। আমেরিকা রওনা দিলাম একা ১৯৮০ সালের অগস্টে। আমার দ্বিতীয় ছেলের বয়স ৫ বছর তখন। আর বাবা ৮২-র কাছাকাছি। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করার কাজে উঠে পড়ে লেগেছেন। এক বছর বাদে ফিরে এলাম। বাবার উৎসাহের কোনো ভাটা নেই। সেই পুরনো রুটিনের কোনো ব্যতিক্রম নেই। খবর সংগ্রহ, তার সত্যতা যাচাই, তারপর ঘটনার ধারাবাহিক সংযোজন করে ভাষার বন্ধনে সুবিন্যস্ত করা---সবকিছু চলে নিয়মমাফিক। এ এক ক্লান্তিহীন পরিশ্রম। শরীর বইতে না চাইলেও টানতে হয়। এ যেন বয়সের কাছে কোনো মতে হার স্বীকার না করে এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ, যদিও দুবার ইতিমধ্যে বাবাকে ‘পেসমেকার’ নিতে হয়েছে ক্লান্ত হৃদয়কে টেনে তোলার জন্য। কী অসীম ও অদম্য মানসিক শক্তি ও স্থৈর্য। এই বয়সে এসে উপলব্ধি করি এ কেবল সম্ভব তাদেরই পক্ষে যারা জীবনকে গভীর ভালোবেসে নিজের লক্ষ্যে অবিচল। যথা সময়ে দ্বিতীয় খণ্ড বেরুল। বাবা শুরু করলেন তৃতীয় খণ্ডের মালমশলা সংগ্রহে। আবার সেই লেখালেখি, খবর সংগ্রহ। আগের রুটিনের কোনো পরিবর্তন নেই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। পুরানো পাইলস রোগটা মাঝেমধ্যে ভোগাচ্ছে। কিন্তু কাজের কোনো বিরাম নেই। সময় সীমিত। সময়ের আগে লক্ষ্যে পৌঁছানোর মরণপণ প্রচেষ্টা। পাণ্ডুলিপি সম্পূর্ণ, কেবল প্রকাশকের কাছে পৌঁছানোর অপেক্ষা। এই সময় ডাক এল হলদিয়াতে যাবার। হলদিয়াতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি উন্মোচন করতে চললেন শারীরিক কষ্ট স্বীকার করেও। সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল। বাবার বয়স তখন ৮৬। ওই অনুষ্ঠানে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ওখানকার হাসপাতালে ভর্তি হলেন। পরে বোন এল বাবাকে দেখতে। বাবা পীযূষদার (মেজ ছেলে) কলকাতার বাসায় যেতে চান। মিটিংয়ের উদ্যোক্তারা গাড়ি করে কলকাতায় পৌঁছে দিলেন বাবাকে। ডাক্তার এল। চিকিৎসা চলল। কখনও একটু ভালোর দিকে---আবার কয়েকদিন বাদে খারাপ হচ্ছে। স্পেশালিস্ট ডাক্তার আনা হল। নূতন করে চিকিৎসা শুরু হল। এইভাবে চলল প্রায় দু-তিন মাস। বাবা যখন ভালো থাকেন ডাইরিতে কিছু লেখেন। ডাইরির লেখা বরাবরের অভ্যাস। মাঝেমধ্যে দেখি আধ-শোওয়া অবস্থায় ঘাড় তুলে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
হঠাৎ করে শরীরটা খারাপের দিকে মোড় নিল। দু-একদিনের মধ্যে আরও খারাপের দিকে। ঠিক হল পিজি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আমি প্রায় রাত দশটার দিকে নিয়ে গেলাম। সবকিছু করণীয় ব্যবস্থা করতে করতে ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। আউটডোর থেকে এবার বেডে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু আরও বেড়েছে নিঃশ্বাসের কষ্ট। ডাক্তার বুকে চাপ দিয়ে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে চলেছেন। এইভাবে কিছুক্ষণ চলল। অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা হল। সব চেষ্টা ব্যর্থ। ডাক্তার আমার দিকে তাকিয়ে। বুঝলাম সবকিছু আয়ত্তের বাইরে। আমার দৃষ্টি স্থির। শূন্যতার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। বাবা হারিয়ে গেল। আজও যখন ওই হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাই, ভেসে ওঠে সেই মুহূর্ত আর মনে মনে বলি এখানে বাবাকে হারিয়েছি। বাবার দেহ নিয়ে ফিরে এলাম। সবাই নীরব। মা আস্তে আস্তে এসে বাবার মাথার বালিশটা ঠিক করে দিল। তারপর আর কী হল আমার মনে পড়ে না। আমি তখন আমার মধ্যে নেই। খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। রেডিওতে সকালের খবর এল। আনন্দবাজারে একটা বাক্য গভীর কালো লেখায় বেরুল---‘বসন্তকুমার আর নেই’।
বসন্তকুমার (দাস)
বাবা তাঁর দীর্ঘ ৮৬ বছরের সংগ্রামী জীবন পরিপূর্ণ করে চলে গেলেন। তার শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণের চিঠিখানা নিয়ে দেখা করলাম তাঁর বিশেষ বন্ধু ও সহপাঠী প্রফুল্লচন্দ্র সেন-এর সঙ্গে। তখন তিনি এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন কলকাতায়। বললেন---‘বসন্ত চলে গেল। আমারও যাবার সময় হয়েছে। শোক কোরো না---।’ শ্রী অতুল্য ঘোষ (বাংলায় কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন) তখন থাকতেন বিধান শিশু উদ্যানের কর্ণধার হয়ে ওই উদ্যানেই। শ্রাদ্ধের চিঠিটা পেয়ে একটা কথা বলেছিলেন---‘সমাজের বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে বসন্তদা তাঁর আচার-আচরণ, জীবনযাত্রা ও কর্মের মাধ্যমে নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছিলেন তা অত্যন্ত গর্বের ও প্রত্যেকের শিক্ষণীয়।’
তাঁর চলে যাওয়ার প্রায় ৪০ বছর পরে আজও তাঁর সেই নিরহংকারী নিরলস এক সত্যনিষ্ঠ কর্মীর চলমান অম্লান ছবি আমাকে নিয়ত উৎসাহিত করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। চাকুরি জীবনে জনৈক অগ্রজ অবাক হয়ে বলেছিলেন কেন আমি এই বয়সে বাংলা লেখায় হাত দিলাম। আমার উত্তর ছিল আমার বাবার লেখক জীবনের পুরোপুরি শুরু প্রায় ৭৩ বছরের জীবনে এসে। সদিচ্ছা ও বিরামহীন অনুশীলনে অনেক কিছু অতিক্রম করা যায়। নূতন প্রজন্ম ভাগ্যবান। তারা প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ স্বাধীন ভারতের নাগরিক। এখন চাই দৃঢ় প্রত্যয় আর আদর্শ। আর তাদের সামনে আছে বসন্তকুমারের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীর জীবন কাহিনি। সেই জীবনের ভগ্নাংশও যদি আত্মস্থ করা যায় অনেক প্রতিবন্ধকতা জয় করা যায়। এ আমার স্থির বিশ্বাস।
M E D I N I K A T H A J O U R N A L
Edited by Arindam Bhowmik
Published on 08.02.2026
নিচে কমেন্ট বক্সে আপনার মূল্যবান মতামত জানান।