খাজরার বীরস্তম্ভ
Hero Stone of Khajra
শুদ্ধসত্ত্ব মান্না।
Home » Medinikatha Journal » Shuddhasattwa Manna » খাজরার বীরস্তম্ভ
বাংলার প্রাচীন ভাস্কর্য গুলির মধ্যে একটি অন্যতম হল বীর স্তম্ভ বা Hero stone। এটি কোন যুদ্ধে বা বীরত্বপূর্ণ কাজে মৃত ব্যক্তির স্মরণে নির্মিত প্রাচীন পাথরের এক স্মৃতিস্তম্ভ। তামিল বা কানাড়িতে এই ভাস্কর্যগুলিকে " বীরকল " বা " বীরকুল্লু " বলা হয়। বাংলা বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ল্যাটেরাইট বা সাধারণ পাথরে খোদাই করে এগুলো তৈরি করা হতো। এটি বাংলা তথা ভারতের প্রাচীন প্রস্তর সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
খাজরার বীরস্তম্ভ (ছবি: শুদ্ধসত্ত্ব মান্না)।
দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকার মূলত বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ( মানভূম ) , মেদিনীপুর ও বীরভূমের বিভিন্ন এলাকায় বিশেষত অজয় দামোদর কংসাবতী নদীর উপত্যকা এলাকায় এদের প্রচুর পরিমাণে দেখা মেলে।
সাধারণত পাথরে খোদাই করে যোদ্ধা, ধনুকধারী বা অশ্বারোহীর মূর্তি তৈরি করা হয়। গবেষকদের অনুমান, এগুলি মোটামুটি খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতাব্দী অর্থাৎ গুপ্ত যুগ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী বা তার পরবর্তী সময়ে নির্মিত।
প্রাচীন তামিল সঙ্গম সাহিত্যে বীরস্তম্ভের সর্ব প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতের উপদ্বীপ অঞ্চলে সম্ভবত এদের সবচেয়ে বেশি আধিক্য ছিল। মেদিনীপুর জেলায় এগুলি সাধারণত পাওয়া গেছে উঁচু ভূমির এলাকায়, উপকূল বা সমতলের নরম মাটির এলাকায় এদের বেশি দেখা যায়নি, অবশ্য দুই একটা ব্যতিক্রম থাকতেও পারে।
বাংলার বীরস্তম্ভ গুলি কম্পোজিশনের দিক থেকে একটু অন্যরকম। বীরের শৌর্য ও মৃত্যু পরবর্তী অন্তিম গন্তব্যের বিশদ বিবরণের পরিবর্তে বাংলা শিল্পীরা সাধারণ এবং সারমর্মভিত্তিক বিবরণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই অর্থে প্রাধান্য পেয়েছে বীর বা সতীর ( নারী অর্থে ) একক অবয়ব। তাঁরা সাধারণ চক্ষুগ্রাহ্য বস্তুকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, ফলে স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বিষয়বস্তু ছিল হাতে একটি তরবারি বা ঢাল বা তীর ধনুক নিয়ে বীর একাকী দাঁড়িয়ে। এই বীরকে অনেক সময়ই ঘোড়ার পিঠে বসা অবস্থাতেও দেখা যায়। অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে এদের হাতির পিঠে বসা অবস্থাতে দেখা যায়! অনেক সময় বীরের সঙ্গে তার মাথার ওপরে ছাতার মতো আচ্ছাদন বহনকারী হিসেবে একজন সহকারীকেও দেখা যায়। এদের সঙ্গেও কোথাও কোথাও কিছু খর্বকায় সহকারীদেরকেও দেখা যায় ।
খাজরার বীরস্তম্ভ (ছবি: শুদ্ধসত্ত্ব মান্না)।
বাংলার বীরস্তম্ভগুলির বেশিরভাগই একটিমাত্র প্যানেলে দেখতে পাওয়া যায়। এই বীরস্তম্ভগুলি স্থানীয় পাথরের ওপরেই উৎকীর্ণ হতো। পুরুলিয়ার শিল্পীরা বেলেপাথর ও ক্লোরাইট স্ফটিক ব্যবহার করেছেন। বর্ধমানে ব্যবহার করা হয়েছে বেলেপাথর আর মেদিনীপুরে লাল মাটির ব্লক। ফলে এক এক স্থানের বীরস্তম্ভগুলি একেক রকম। লাল মাটির ব্লকে বা মাকড়া পাথরে নির্মিত মেদিনীপুরের বীরস্তম্ভগুলি পাথরের অসম পৃষ্ঠের ঘর্ষণে বেশিরভাগই তার সূক্ষতা হারিয়েছে।
এই জায়গার বীরস্তম্ভগুলি বেশিরভাগই এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান এলিট শ্রেণীর মানুষের এবং স্থানীয় মানুষজনদের সংঘাতের স্মৃতি বহন করে চলেছে। যদিও লিপিতথ্যে কিংবা অন্য কোন লিখিত উৎসে এগুলির উল্লেখ নেই তবুও বলা যেতে পারে, এই অঞ্চলে যে বিভিন্ন বহিরাগতরা ( যেমন আফগান মোগল মারাঠা etc ) আক্রমণ চালিয়েছিল তাদের স্মৃতিও এগুলির মধ্যে ধরা থাকতে পারে।
পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি -খড়গপুর রাজ্য সড়কের পাশে খাজরাতে ( ২২°১২'২৩" উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৭°১৫'৩৩" পূর্ব দ্রাঘিমাংশ ) খাজরা সতীশ চন্দ্র মেমোরিয়াল হাইস্কুলের উল্টোদিকে সুবীর গিরির বাস্তু জমিতে একটি বড় পাথরের বীরস্তম্ভ দেখা যায়। এই ভাস্কর্যটিতে ঘোড়ায় আসীন এক পুরুষকে দেখা যায় - যার বাম হাতে রয়েছে ঢাল এবং ডান হাতে তরবারি । এটি দৈর্ঘ্যে ৩'৪" প্রস্থে ১'৫" এবং এটি ১০" পুরু ব্যাসের। জানা যায়, বসতবাটি নির্মাণের সময় মাটি খুঁড়ে এটিকে পাওয়া যায়। বর্তমানে মূর্তিটির মাথায় সিঁদুরের প্রলেপ দেখা যায়। অনুমান করা যায়, স্থানীয় কেউ হয়তো একে দেবীজ্ঞানে পুজো করেছেন ( শীতলা কি??) !
কিন্তু খাজরার মত বর্ধিষ্ণু গ্রামে এই ভাস্কর্যটি পাওয়া খুব একটা আশ্চর্যজনক বলে মনে হয় না, কারণ এই এলাকায় আর কোথাও এমন ভাস্কর্য আর পাওয়া না গেলেও খাজরা কুলটিকরি রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে কিয়ারচাঁদ, রানা, মরা দিঘি, বালি বিল, রনবনিয়া প্রভৃতি গ্রামগুলিতে অনেক বীরস্তম্ভ, বৌদ্ধ ও জৈন মূর্তি - ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায় -যেগুলির বিরাট গুরুত্ব রয়েছে ।
খাজরার এই মূর্তি পূর্ববর্তী সেই যুগের কেউ হয় তাদের পরিবারের কারোর স্মৃতিতে বানিয়েছিলেন নতুবা কেশিয়াড়ী অঞ্চলে কালাপাহাড়, মোগল, মারাঠা বর্গীদের আক্রমণের স্মৃতিকে ধরে রাখতে বানিয়েছিলেন।
আশা করা যায়, আগামী দিনে এই অঞ্চলে নিবিড় অনুসন্ধানের ফলে আরও কোন ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হবে এবং তার গুরুত্ব আমাদের সামনে নতুন ভাবে উন্মোচিত হবে।।
M E D I N I K A T H A J O U R N A L
Edited by Arindam Bhowmik
Published on 23.08.2026
তথ্য সহায়তা :
● উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য ইন্টারনেট সাইট
বিশেষ কৃতজ্ঞতা :
● মাননীয় সুমন কুমার গিরি, মাননীয় রামপ্রসাদ বেরা, সহ শিক্ষক, খাজরা সতীশ চন্দ্র মেমোরিয়াল হাই স্কুল ( উচ্চমাধ্যমিক )