আন্তর্জাতিক রাজকাঁকড়া দিবস এবং মেদিনীপুর জেলার উপকূলবর্তী মানুষের দায়িত্ব
International Horseshoe Crab Day and the responsibilities of the coastal people of Midnapore district.
অরিন্দম ভৌমিক।
আজ ২০ জুন—আন্তর্জাতিক রাজকাঁকড়া দিবস (International Horseshoe Crab Day)। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এই জীবটিকে রক্ষা করতে ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর পক্ষ থেকে এই বিশেষ দিনটি ঘোষণা করা হয়।
International Horseshoe Crab Day and the responsibilities of the coastal people of Midnapore district.
আন্তর্জাতিক রাজকাঁকড়া দিবসের গুরুত্ব
রাজকাঁকড়া বা Horseshoe Crab আসলে কোনো সাধারণ কাঁকড়া নয়, এরা মাকড়সা ও বিচ্ছুর প্রজাতিভুক্ত জীব। এদের গুরুত্ব মূলত তিনটি কারণে অপরিসীম:
• জীবন্ত জীবাশ্ম (Living Fossil): এরা ডাইনোসরদের চেয়েও প্রায় ২০ কোটি বছর আগে অর্থাৎ প্রায় ৪৫ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই টিকে রয়েছে। এদের বাঁচিয়ে রাখা আমাদের পৃথিবীর বিবর্তন ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার সমান।
• চিকিৎসা বিজ্ঞানে নীল রক্তের অবদান: রাজকাঁকড়ার রক্তে তামা থাকার কারণে তা নীল রঙের হয়। এদের রক্তে উপস্থিত বিশেষ উপাদান (LAL - Limulus Amebocyte Lysate) যেকোনো ইনজেকশন, প্রতিষেধক (ভ্যাকসিন) এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা টক্সিন আছে কি না তা পরীক্ষা করতে ব্যবহৃত হয়। মানবজাতিকে মহামারী ও রোগ থেকে বাঁচাতে এদের অবদান অনস্বীকার্য।
• উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য: অমাবস্যা ও পূর্ণিমার ভরা কোটালের সময় এরা সমুদ্রের বালুতটে ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলো পরিযায়ী পাখিদের প্রধান খাদ্য, যা উপকূলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে।
International Horseshoe Crab Day and the responsibilities of the coastal people of Midnapore district.
মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী মানুষের কর্তব্য ও দায়িত্ব
বর্তমানে অতিরিক্ত পর্যটন, অনিয়ন্ত্রিত মাছ চাষ এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে দীঘা বা জুনপুটের সৈকত থেকে রাজকাঁকড়ারা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে ভারত থেকে এই প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে। তাই মেদিনীপুরের উপকূল অঞ্চলের বাসিন্দাদের কিছু বিশেষ কর্তব্য রয়েছে:
১. মাছ ধরার জালে আটকে যাওয়া রাজকাঁকড়া উদ্ধার
মৎস্যজীবী ভাইদের প্রধান ভূমিকা নিতে হবে। ইলিশ বা অন্য মাছ ধরার সময় ট্রলারের জালে প্রায়ই রাজকাঁকড়া আটকে পড়ে। অনেকেই এদের গুরুত্ব না বুঝে ডাঙায় ফেলে রাখেন বা মেরে ফেলেন। কর্তব্য হলো: জালে রাজকাঁকড়া উঠলে অত্যন্ত সাবধানে সেটিকে ছাড়িয়ে আবার জীবিত অবস্থায় সমুদ্রে ফিরিয়ে দিতে হবে।
২. উল্টে যাওয়া কাঁকড়াকে সোজা করা (Just Flip 'Em)
রাজকাঁকড়া যখন ডিম পাড়তে সৈকতে আসে, অনেক সময় ঢেউয়ের ধাক্কায় এরা উপুড় বা উল্টে যায়। পিঠের শক্ত খোলসের কারণে এরা সহজে নিজে থেকে সোজা হতে পারে না। রোদ এবং পাখিদের আক্রমণে এদের মৃত্যু হয়। কর্তব্য হলো: সৈকতে কোনো উল্টে যাওয়া রাজকাঁকড়া দেখলে তার লেজটি (Telson) না ধরে, খোলসের দু-পাশ ধরে সাবধানে সোজা করে দিতে হবে যাতে তারা আবার জলে ফিরে যেতে পারে।
৩. প্রজনন ক্ষেত্র ও ডিম রক্ষা করা
ভরা পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় দীঘা, জুনপুট বা মন্দারমণির কাদামাটি ও বালিময় সৈকতে এরা জোড়ায় জোড়ায় এসে ডিম পাড়ে। স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের সচেতন হতে হবে যাতে সেই সময় সৈকতে অতিরিক্ত আলো বা মানুষের কোলাহলে এদের প্রজনন ব্যাহত না হয়। এদের পাড়া ডিমগুলোকে নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. পর্যটন ও পরিবেশ দূষণ রোধ
দীঘা-মন্দারমণির সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য, ভাঙা কাচ এবং হোটেলের রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। সৈকতের বালির গঠন নষ্ট হলে এরা ডিম পাড়ার জায়গা পায় না। এছাড়া সমুদ্রতীরে বেআইনিভাবে চারচাকা গাড়ি চালানো বন্ধ করা দরকার, কারণ গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে বহু রাজকাঁকড়া ও তাদের ডিম নষ্ট হয়।
মনে রাখবেন: আমাদের মেদিনীপুরের সমুদ্র উপকূল কেবল পর্যটনের জায়গা নয়, এটি কোটি কোটি বছর পুরনো এক অমূল্য প্রাণীরও বাসস্থান। প্রকৃতির এই অনন্য উপহারকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।
International Horseshoe Crab Day and the responsibilities of the coastal people of Midnapore district.
চিকিৎসা বিজ্ঞানে রাজকাঁকড়া বা Horseshoe Crab-এর অবদান আক্ষরিক অর্থেই জীবনদায়ী। এদের শরীর দিয়ে প্রবাহিত লিম্ফ বা নীল রক্ত মানুষের তৈরি যেকোনো ইনজেকশনযোগ্য ওষুধ, স্যালাইন এবং ভ্যাকসিনের বিশুদ্ধতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
নিচে এদের নীল রক্তের চিকিৎসাগত গুরুত্ব এবং ভ্যাকসিন পরীক্ষার পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. নীল রক্তের চিকিৎসাগত গুরুত্ব ও অনন্যতা
আমাদের রক্তে যেমন আয়রন বা লোহা থাকার কারণে রক্তের রঙ লাল হয়, রাজকাঁকড়ার রক্তে তেমনই থাকে তামা (Copper), যার কারণে এদের রক্তের রঙ ছাই-নীল দেখায়। তবে চিকিৎসার ক্ষেত্রে এর আসল ম্যাজিক লুকিয়ে রয়েছে এর রক্তকণিকায়, যাকে বলা হয় অ্যামিবোসাইট (Amebocytes)।
ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণের প্রাকৃতিক ঢাল: রাজকাঁকড়ার শরীরে কোনো উন্নত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা লিম্ফ নোড থাকে না। তাই সমুদ্রের কোটি কোটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচতে প্রকৃতি এদের এক অনন্য ক্ষমতা দিয়েছে। এদের রক্তে সামান্যতম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ঘটলে অ্যামিবোসাইট কোষগুলো ফেটে যায় এবং রক্ত জমাট বেঁধে একটি শক্ত জেলির মতো আস্তরণ তৈরি করে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়া শরীরের বাকি অংশে ছড়াতে পারে না।
টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ প্রতিরোধ: চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো এন্ডোটক্সিন (Endotoxin)। এটি এক ধরণের বিষাক্ত পদার্থ যা গ্রাম-নেগেটিভ (Gram-negative) ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর থেকে নির্গত হয়। মানুষের রক্তে এই এন্ডোটক্সিন প্রবেশ করলে তীব্র জ্বর, সেপটিক শক, অঙ্গ বিকল হওয়া, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। মানুষের তৈরি কোনো সাধারণ রাসায়নিক পরীক্ষা এতো দ্রুত ও নিখুঁতভাবে এই এন্ডোটক্সিন সনাক্ত করতে পারে না, যা রাজকাঁকড়ার রক্ত পারে।
২. LAL পরীক্ষার মাধ্যমে ভ্যাকসিনের বিশুদ্ধতা যাচাই
রাজকাঁকড়ার নীল রক্ত থেকে তৈরি করা হয় একটি বিশেষ নির্যাস, যার নাম LAL (Limulus Amebocyte Lysate)। যেকোনো নতুন প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন (যেমন কোভিড-১৯, পোলিও বা ধনুষ্টঙ্কারের ভ্যাকসিন) মানুষের শরীরে প্রয়োগ করার আগে তা এই LAL পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়।
পরীক্ষার ধাপসমূহ:
ধাপ ১ (রক্ত সংগ্রহ ও নির্যাস তৈরি): ল্যাবরেটরিতে রাজকাঁকড়ার শরীর থেকে নীল রক্ত সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে অ্যামিবোসাইট কোষগুলোকে আলাদা করা হয়। এই কোষগুলো ভেঙে যে সাদা পাউডারের মতো উপাদান পাওয়া যায়, তাকেই LAL বলে।
ধাপ ২ (ভ্যাকসিনের নমুনা মিশ্রণ): উৎপাদিত ভ্যাকসিনের একটি নির্দিষ্ট ব্যাচ থেকে নমুনা নেওয়া হয়। এরপর সেই নমুনার সাথে তরল LAL নির্যাসটি মেশানো হয়।
ধাপ ৩ (ফলাফল পর্যবেক্ষণ):
International Horseshoe Crab Day and the responsibilities of the coastal people of Midnapore district.
যদি ভ্যাকসিনের নমুনায় কোনো ব্যাকটেরিয়া বা এন্ডোটক্সিন না থাকে, তবে তরল মিশ্রণটি একদম স্বচ্ছ ও তরলই থেকে যায়। এর অর্থ ভ্যাকসিনটি সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বিশুদ্ধ।
যদি ভ্যাকসিনের নমুনায় এক ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগও (১ পিপিটি) এন্ডোটক্সিন থাকে, তবে LAL নির্যাসটি তার সাথে বিক্রিয়া করে মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে পুরো তরলটিকে একটি ঘন জেলিতে (Clot) পরিণত করে ফেলে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: যদি কোনো ভ্যাকসিনের ব্যাচ পরীক্ষায় জেলি বা ক্লট তৈরি করে, তবে ধরে নেওয়া হয় যে ভ্যাকসিনে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটেছে। সাথে সাথে ভ্যাকসিনের ওই পুরো লটটি বাতিল করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, আপনার-আমার শরীরে যে ভ্যাকসিন বা ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে, তা শতভাগ জীবাণুমুক্ত কিনা, তার চূড়ান্ত সার্টিফিকেট দেয় এই রাজকাঁকড়া।
International Horseshoe Crab Day and the responsibilities of the coastal people of Midnapore district.
একটি মানবিক ও পরিবেশগত সংকট
প্রতি বছর চিকিৎসা ক্ষেত্রের প্রয়োজনে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ রাজকাঁকড়া ধরে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের শরীর থেকে প্রায় ৩০% রক্ত নিষ্কাশন করে আবার তাদের সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়। কাগজে-কলমে এদের মারা হয় না ঠিকই, কিন্তু ল্যাব থেকে ফেরার পর এদের একটি বড় অংশ দুর্বল হয়ে মারা যায় অথবা ডিম পাড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই নীল রক্তের বিকল্প হিসেবে গবেষণাগারে কৃত্রিম উপাদান (rFC - Recombinant Factor C) তৈরি করতে সফল হয়েছেন, যা ইউরোপের বেশ কিছু জায়গায় স্বীকৃতিও পেয়েছে। রাজকাঁকড়াদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বিশ্বজুড়ে এই কৃত্রিম উপাদানের ব্যবহার বাড়ানোর জোর দাবি উঠছে।